বাংলার ভোর প্রতিবেদক

যশোরের চৌগাছা উপজেলার বাকপাড়া গ্রামের আব্দুল করিম ঠান্ডু। এক পুত্র সন্তানের জনক ঠান্ডু গত দুই বছর ফিজিতে প্রবাস জীবন কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে দেশে ফেরেন। কিন্তু দেশে ফেরার আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

চলতি মে মাসের শুরুর দিকে পেটে অসহনীয় ও তীব্র ব্যথা অনুভব করেন ঠান্ডু। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেলেও ব্যথা পুরোপুরি কমেনি। পরে যশোরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানকার চিকিৎসকরা পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে জানান, তার কিডনিতে টিউমার হয়েছে এবং দ্রুত রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হলে সেখানেও চলে দফায় দফায় পরীক্ষা নিরীক্ষা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেখানে দিনের পর দিন ঘুরেও রোগ নির্ণয় বা সঠিক চিকিৎসার কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পাচ্ছিলেন না ঠান্ডু ও তার পরিবার। চারদিক তখন অন্ধকার আর অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা। ঢাকায় সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে চরম হতাশায় ভুগতে থাকেন ঠান্ডু।

এমতাবস্থায় নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে যশোর মেডিকেল কলেজের কলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার মাহমুদুল হাসান পান্নুর সন্ধান পান ঠান্ডু। গত ১৬ মে ঠান্ডু ডাক্তার পান্নুর চেম্বারে আসেন।

রোগীর শারীরিক অবস্থা ও পূর্বের রিপোর্টগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি নতুন কিছু সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করান ডাক্তার পান্নু। আর তাতেই বেরিয়ে আসে প্রকৃত তথ্য। ডাক্তার পান্নু নিশ্চিত হন যে, এটি সাধারণ কোনো কিডনি টিউমার নয়; বরং রোগী আসলে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল স্ট্রোমাল টিউমার (এওঝঞ) রোগে আক্রান্ত। কিন্তু ততদিনে বিশালাকৃতির এই টিউমারটি রোগীর পুরো পেটে ভরাট হয়ে নাড়িভুঁড়ির সাথে পেঁচিয়ে গেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে ডাক্তার পান্নু রোগীর স্বজনদের জানান, দ্রুত অস্ত্রোপচার না করা হলে রোগীর জীবন যেকোনো মুহূর্তে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। চিকিৎসকের প্রতি আস্থা রেখে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন ঠান্ডুর পরিবার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১৭ মে দিবাগত রাত ১২টা ১৫ মিনিটে যশোর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শুরু হয় এই জটিল অপারেশন। ডাক্তার মাহমুদুল হাসান পান্নুর নেতৃত্বে একটি সুপ্রশিক্ষিত ও ডেডিকেটেড বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এই অপারেশনে অংশ নেন। সফল অস্ত্রোপচার শেষে ঠান্ডুর পেট থেকে বের করে আনা হয় প্রায় ২০ কেজি ওজনের একটি দানবাকৃতির টিউমার। শুধু টিউমার অপসারণই নয়, জীবন রক্ষার্থে অপারেশনের সময় রোগীর নাড়ির যে অংশটি কেটে আলাদা করতে হয়েছিল, তাও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পুনরায় সেলাই করে জুড়ে দেন চিকিৎসক দলটি।

প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের পর টানা ৫ দিন ঠান্ডুকে মুখে কোনো খাবার খেতে দেওয়া হয়নি, রাখা হয়েছিল নিবিড় পর্যবেক্ষণে। বর্তমানে তিনি পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত এবং স্বাভাবিক খাবার খেতে পারছেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে অশ্রুসজল চোখে আব্দুল করিম ঠান্ডু বলেন, ‘আমি যেন সত্যি সত্যি একটা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। পেটের ভেতরের সেই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে আল্লাহ আমাকে রেহাই দিয়েছেন।’

ঠান্ডুর স্ত্রী কবিতা খাতুন আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করে বলেন, ‘আল্লাহর রহমত আর ডাক্তার পান্নুর চেষ্টাতেই আমার স্বামী আবার সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন, একজন স্ত্রীর কাছে এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।’
এ বিষয় জানতে চাইলে কলোরেক্টাল সার্জন ডাক্তার মাহমুদুল হাসান পান্নু দৈনিক ‘বাংলার ভোর’কে বলেন, আমার পেশাগত জীবনের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের সঠিক রোগ নির্ণয় ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। রোগী ঠান্ডু যে জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন, তা কেবল একজন দক্ষ কলোরেক্টাল সার্জনের পক্ষেই সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব ছিল। আনন্দের বিষয় হলো, রোগী সঠিক সময়ে সঠিক ডাক্তার বেছে নিতে পেরেছিলেন। অপারেশন সফল হয়েছে এবং খুব দ্রুতই তিনি স্বাভাবিক সব কাজকর্ম করতে পারবেন বলে আশা করি।

ডা. পান্নু আরও বলেন, টিউমারটি এতটাই বড় এবং জটিলভাবে নাড়ির সাথে পেঁচিয়েছিল যে, অস্ত্রোপচারটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আমাদের একটানা সাড়ে ৩ ঘণ্টা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ করতে হয়েছে।

ঢাকার মতো ব্যয়বহুল ও বড় শহরের বাইরে মফস্বলে এমন জটিল অপারেশন সম্ভব কি না জানতে চাইলে ডাক্তার পান্নু অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য দেন। তিনি নিশ্চিত করেন, কলোরেক্টাল সার্জারির এই আধুনিক ও জটিল সকল চিকিৎসা তিনি যশোরের সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং স্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে নিয়মিত করে আসছেন।

এর ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অনন্য ও বিরল সাফল্যের সাক্ষী হলো যশোর বলে মনে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরাসহ পুরো জেলাবাসী।

Share.
Exit mobile version