রুদ্র নীল
ঈদ সমাগত। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খরচ। নিজের বিলাসবহুল জীবন ও পরিবারের চাহিদা পূরণে মরিয়া হয়ে উঠেছে যশোরের কয়েক ডজন সাংবাদিক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের ছুটে চলা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, হাসপাতাল-ক্লিনিক, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের দ্বারে দ্বারে।

২০ রোজার আগ পর্যন্ত তাদের ভাষা ছিল ‘বস, ইফতারির আয়োজন করছি, বিষয়টা একটু দেখেন’, ‘বস, মানিব্যাগে একটু হাত দেন।’

২০ রোজা পার হতেই সেই সুর বদলে গেছে। এখন বলা হচ্ছে ‘সারাবছর আপনাদের নিউজ কাভারেজ করি। বারবার তো আসি না, উৎসব-পার্বণে একটু আসি। বস, ঈদে একটা পাঞ্জাবি কেনার টাকা দেন।’

আবার কেউ কেউ বলছেন, আমি সাংবাদিকদের নেতা। আমার এই ফাণ্ড থেকে সব সাংবাদিককে ঈদের খরচ দেয়া হবে।
হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে শহরে বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে। এমন কর্মব্যস্ত সাংবাদিক পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। ৩৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা করা মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিও যেন হঠাৎ প্রো-অ্যাকটিভ হয়ে মাঠে নেমেছেন ফান্ড কালেকশনের কাজে।

সকালে পরিবারকে বলা হচ্ছে ‘অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট আছে, নিউজের চাপ বেশি, কখন বাড়ি ফিরবেন বলা যাচ্ছে না’। এরপর পরিপাটি পোশাক, চোখে সানগ্লাস, কোমরে চ্যানেলের বুম ও গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে শুরু হয় দপ্তরে দপ্তরে ঘোরাঘুরি। যেসব দপ্তরে নিয়মিত অনিয়ম হয়, যেসব অসাধু কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত -তাদের কাছেই এই বেশভূষার সাংবাদিকদের কদর বেশি। ফলে তথাকথিত এই ‘হেস্কা মিশনে’ নামা সাংবাদিকরা বেশ সফলতাই দেখছেন।

সূত্র বলছে, চাঁদ রাত পর্যন্ত চলবে এই চান্দাবাজি। মোবাইল ব্যংকিং এর মাধ্যমেও আসবে টাকা। শুধু কার্ডধারী টিভি সাংবাদিকরাই নয়, এ কাজে পিছিয়ে নেই এক সময়ের ‘৩০বছর ৩৫ বছর সাংবাদিকতা করি’ গল্প শোনানো কিছু প্রবীণ সাংবাদিকও। কিছু নবীন তুর্কি, বছর না ঘুরতেই নিজের চেহারা চেঞ্জ হয়ে যাওয়া তারকা সাংবাদিকরাও পিছিয়ে নেয় এই হেস্কা মিশনে। কেউ কেউ আবার ‘বাংলার ভোর’ পত্রিকার সম্পাদক পরিচয় দিয়ে পাসপোর্ট অফিস, হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ট্রাফিক অফিস থেকেও মাশোহারা তুলছেন।

ঈদ সামনে রেখে যেন এককালীন চাঁদাবাজির ব্যবসা এখন রমরমা হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলার ভোর পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক সৈয়দ আবুল কালাম শামছুদ্দীন জ্যোতির সঙ্গে। তিনি বলেন, বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এই পেশায় এসেছি। আমি কখনো কোথাও একটি টাকাও চাঁদাবাজি করিনি, করার প্রয়োজনও পড়ে না। তবে আমার পত্রিকার নাম ব্যবহার করে বা সম্পাদক পরিচয় দিয়ে কেউ কোথাও টাকা চাইলে আমাকে জানাবেন। প্রয়োজনে আইনের সহায়তা নেবেন। একই সাথে তিনি যশোরের সংবাদপত্র পরিষদ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে অনুরোধ করেন এসব সাংবাদিক নামধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক বলেন, আমরা অনেক সময় কোনো জায়গায় নিউজের জন্য গেলেই সাথে সাথে শোনানো হয় বড় বড় সাংবাদিকের নাম-ঠিকুজি। আসে নিউজ না করার জন্য সুপারিশ। অনেক সাংবাদিক ও নেতা সেখান থেকে অনৈতিক সুবিধা নেন। বিশেষ করে উৎসব সামনে রেখে এই সুবিধা নেয়ার রেওয়াজ আছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয়।

বিআরটিএ, পাসপোর্ট ও ট্রাফিক অফিস, সাবরেজিস্ট্রি অফিসসহ কয়েকটি সরকারি কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভাই ১০ রোজার পর থেকেই একের পর এক সাংবাদিক আসছে। কাকে দেবো, কাকে দেবো না বুঝতে পারি না। দেবোই বা কোথা থেকে? আমরা যে ঈদ বোনাস পাই, তার সব দিয়েও সাংবাদিক খুশি করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। অনেকে এসে নিজেকে এমনভাবে জাহির করে যেন টাকা না দিলে উপায় নেই। এই অবস্থায় অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখছেন। কেউবা তার সহকারীদেরকে বলছেন ‘স্যার’ বাইরে আছেন জানাতে।

এটাকে আপনি কি সাংবাদিকতা বলবেন? আসলেই দায়টা বেশি কার? পত্রিকার টেলিভিশনের মালিক-কর্তৃপক্ষ, সাংবাদিক সংগঠন-নেতা, নাকি সাংবাদিকের?
এই ধারা বন্ধ না হলে প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। পেশাটির প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে আসুন অন্যকে দেয়া উপদেশ নিজেরাই আগে আমল করি।

Share.
Exit mobile version