কাজী মাজেদ নওয়াজ
একদিকে গ্রামের একদল শিশু-কিশোর খেলাচ্ছলে ইট ছুড়ছে, বিরক্ত করছে, পাগলী পাগলী বলে ডাকছে। আর অন্যদিকে আলুথালু এক বয়স্ক নারী (পাগলী) চিৎকার করছেন, গালাগাল করে ধেয়ে আসছেন বারংবার।

পা থেকে রক্ত ঝরছে আর ছেলেমেয়েরাও বিপুল উৎসাহে তাকে বিরক্ত করে যাচ্ছে। এই অবস্থা দেখে কিশোর আরজু-নাম পরিচয় না জানা এক বয়স্ক অসুস্থ নারীকে নিয়ে আসলেন বাড়িতে।

বাড়ির কেউ-কেউ একটু বিরক্ত হলেও মায়ের প্রশ্রয়ে তাকে সাবান দিয়ে গোসল করানো হলো, খাবার দেয়া হলো, ডাক্তার দেখিয়ে বাড়িতেই তার থাকার ব্যবস্থা করা হলো। ছোটবেলা থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার এক অদম্য ও জেদি মনোভাব প্রথম লক্ষ্য করেন তার মা। তিনি তাকে উৎসাহ আর প্রশ্রয় দিয়েছেন সকল কাজে সবসময়।

যশোর শহর থেকে একটু দূরে এনায়েতপুর গ্রামে আজাদুল কবির আরজুর জন্ম ১৯৫৩ সালে। বাবা একেএম আমজাদ আলী, মা আনোয়ারা বেগম। গ্রামে জন্ম হলেও বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে কেটেছে বিভিন্ন থানা শহরে। মূলত যশোর শহরেই তার বেড়ে ওঠা। কৈশোর পেরোনো তারুণ্যের উত্তাল দিনগুলো কেটেছে যশোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

গল্প ও কবিতা লেখা, দেয়ালপত্রিকা প্রকাশ, আবৃত্তি ও অভিনয়সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতি সচেতন তরুণ আরজু একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে নিজ উদ্যোগে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৭১ সালে প্রায় ১৮ বছর বয়সে যশোরের মণিরামপুর থেকে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। রাজাকাররা তার প্রতি অমানবিক অত্যাচার করে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। সেখানেও তিনি নির্যাতনের শিকার হন। এরপর তার স্থান হয় যশোর কারাগারে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হবার আগ পর্যন্ত তিনি কারাগারেই ছিলেন।

তরুণ আরজু ভেবেছিলেন স্বাধীনতা পেলেই অবসান হবে সব সমস্যার। সবাই পাবে সমান অধিকার আর সমান মর্যাদা। ভেবেছিলেন এবার দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে। কিন্তু তিনি দেখলেন সদ্য স্বাধীন দেশে গ্রামের মানুষ আগের মতোই অভাব-অনটনের মধ্যে জীবনযাপন করে যাচ্ছে। দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করতে হিমসিম খাচ্ছে।

অনেকেই অল্পকিছু টাকার জন্য টিপসই দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে একদিন যশোর থেকে বাসে ঝিকরগাছা যাচ্ছিলেন। বাসটি থামলে গ্রামের এক বয়স্ক নারী আতঙ্কিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি ঝিনাইদহ যাবেন চলে এসেছেন ঝিকরগাছা। সব কাজ ফেলে আরজু ফিরতি বাসে তাকে ঝিনাইদহ পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন।

এসব খুবই সাধারণ ঘটনা, যা সবার চোখেই বিভিন্ন সময়ে পড়েছে। কিন্তু সদ্য যুবক আরজুকে প্রতিটি ঘটনায় নতুন করে ভাবায়। পিতা ও ভগ্নিপতির চাকরির সুবাদে প্রায়ই যশোর কালেক্টরিতে যেতেন আরজু। কালেক্টরি ক্যান্টিনে ঢোকার মুখে প্রায়ই লাইন দিয়ে বসে থাকতে দেখতেন কিছু মানুষকে। প্রথমদিকে মনে করতেন এরা ভিখারি। একদিন লক্ষ্য করেন এরা আসলে ভিখারি নয়, চা খেতে এসেছেন।

হোটেলের মেসিয়ার চা ঢেলে দিচ্ছে দূর থেকে, যেন হোটেলের পাত্রে তার ছোঁয়া, এমনকি তাকে ছোঁয়া বাতাসের স্পর্শও যেন গায়ে না লাগে। আবার পয়সাটা ঠিকই হাত পেতে নিচ্ছে। এরা কারা-এরা সুইপার, এরা মুচি এরা অস্পৃশ্য। যুবক আরজু ভাবতে থাকে-এইকি আমাদের স্বাধীনতা? এই কি আমাদের মর্যাদা? এ দেশ কি আমাদের সবার? গেলেন সুইপার কলোনিতে বা হরিজনপল্লীতে, দেখলেনÑ তারা ভালোই আয় করে। কিন্তু নেশা করে সব উড়িয়ে দেয়।

নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নারী-পুরুষ আর শিশুরা। এদের নিয়ে ভাববার কেউ নেই। নিজেকে সভ্য ও শিক্ষিত ভাবতে যেন তার রুচিতে বাঁধলো। ভাবলেন আমাদের সামর্থ্য হয়তো কম, কিন্তু কিছুতো করতে পারি! যদি সচেতন করতে পারি, লিখতে-পড়তে শেখাতে পারি, তাহলে হয়তো তারা নিজেরাই নিজেদের উন্নতির চেষ্টা করতে পারবে। এই চিন্তা থেকে ১৯৭৫ সালে আরজু কয়েকজন সমমনা বন্ধুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন জাগরণী চক্র।

নিজেদের হাত-খরচের টাকা জমিয়ে যশোর শহরে শুরু করলেন ব্যবহারিক বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। যার শিক্ষার্থী হলেন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী। তৎকালীন জেলা প্রশাসকসহ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এইসব শিক্ষাকেন্দ্রে আমন্ত্রণ জানালেন। তারা আসলেন, শুনলেন, স্বচক্ষে দেখলেন অবহেলিত মানুষদের পরিস্থিতি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল আউয়াল বললেন-বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ, আমরা সকলেই এ দেশের নাগরিক।

সংবিধান অনুযায়ী আমরা সবাই এক, সবার সমান অধিকার। এভাবেই তরুণ আরজু তার সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে সহযোদ্ধা বন্ধুদের নিয়ে শুরু করলেন শিক্ষা আর সচেতনতার কাজ। এরই মধ্যে আরজু চাকরি নেন সোনালী ব্যাংক, নড়াইল প্রধান শাখায় অফিসার পদে।

বিকেল পর্যন্ত অফিস করে নড়াইল থেকে যশোর ফিরে প্রতিদিন লেগে যান শিক্ষাকেন্দ্রের কাজে। এভাবে কিছুদিন চলার পর একদিন ব্যাংক থেকে হিসাব মিলিয়ে আসতে অনেক রাত হয়। যশোরে ফিরে শিক্ষাকেন্দ্রের কাজ আর করতে পারেননি সেদিন। এভাবে অফিস করে মানুষের জন্য কাজ করা যাবে না।

পরদিন তিনি ছেড়ে দিলেন নিশ্চিন্ত জীবনের হাতছানি দেয়া সরকারি চাকরি। শুরু হলো মানুষকে সচেতন করার, মর্যাদাবান করার এক অনিশ্চিত যাত্রা। কেবলমাত্র নিজের ইচ্ছা শক্তির জোরে শুরু হওয়া ব্যবহারিক বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র চালু হলেও পাঠদানে অগ্রগতি তেমন হচ্ছিল না। একদিন যশোর চার্চের ফাদার ড. লুসিডিও চেচি শিক্ষাকেন্দ্র দেখে বললেন- তোমরা যেভাবে পাঠদান করছো তাতে বয়স্করা ভালো শিখবে না। এই পদ্ধতিতে শিশুরা শিখবে। তার পরামর্শে পাওলো ফ্রেইরির বই পড়ে ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই তৈরি করলেন শিক্ষক সহায়িকা, বয়স্কদের উপযোগী বই। আবার নতুন উদ্যমে শুরু হলো নিজেদের তৈরি উপকরণ দিয়ে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র।

১৯৮১ সালে যশোরে যৌনকর্মী ও তাদের সন্তানদের নিয়ে সরকারি এক সমীক্ষা কাজে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে প্রথমবার যশোরের যৌনপল্লীতে যান। সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে যেয়ে মানুষের আরেক চরম অমানবিক আর অপমানকর জীবনযাপনের মুখোমুখি হন। এক যৌনকর্মীর কোলে নবজাতক এক শিশুকে দেখে নিজের অজান্তেই বলে ফেলেন- ‘তোমার সন্তান কার পরিচয়ে বড় হবে?’ শ্যমলাবরণ মেয়েটি তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে চুমু খেয়ে বলেছিল- ‘তাই বলে কি মা হবো না?’ একদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নির্যাতন, বঞ্চনা আর অন্যদিকে মাথা উঁচু করে সব বাধা তুচ্ছ করা মাতৃত্বের শাশ্বত রূপ আরজুকে নতুন ভাবনায় ফেলে দেয়। আমাদের সমাজ যৌনকর্মীদের ঘৃণা করে, আবার এদেরই গর্ভে জন্ম দেয় সন্তান।

কিন্তু সন্তানের স্বীকৃতি দেয় না, দায়িত্ব নেয় না। যশোর, মাগুরা ও ফুলতলা পতিতালয়ের যৌনকর্মী এবং যশোর শহরের ভাসমান যৌনকর্মী এবং তাদের সন্তানদের জন্য তার উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়েছে নানা প্রকল্প। তৈরি করা হয়েছে যৌনকর্মীর সন্তানদের জন্য শেল্টার হোম-যে শেল্টারহোমে যৌনকর্মীর সন্তানেরা আরজুর পিতৃস্নেহের ছায়ায় সমাজের আর দশজন সাধারণ শিশুর মতো মর্যাদা নিয়ে বেড়ে উঠছে। শুধু পরিচয়ের জন্য কাগুজে পিতা নয়, তিনি হয়ে ওঠেন তাদের সত্যিকারের পিতা, অভিভাবক।

এই সব ছেলেমেয়েদের অনেকেই এখন উচ্চশিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে মর্যাদাকর জীবনযাপন করছে।
আরজুর প্রজ্ঞা ও পরিশ্রমে গড়ে ওঠা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন সমাজ উন্নয়নে ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী কাজের জন্য আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সুপরিচিত।

তার সুদক্ষ পরিচালনায় জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, দরিদ্র মানুষের নিজস্ব সংগঠন প্রতিষ্ঠা, আত্মনির্ভর সংগঠন প্রতিষ্ঠা, ক্ষুদ্রঋণ ও মানবাধিকার নিয়ে ৫২টি জেলায় প্রায় বারো লাখ দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের সাথে কাজ করছে। বর্তমানে সংস্থা দরিদ্র পরিবারের ১ লাখ ৩ হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সহায়তা দিচ্ছে।

(***সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতিবছর সদস্য’র সন্তানদের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বোর্ড ফি এবং জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের এককালীন পাঁচ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়া হয়।) দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে আরজুর উদ্যোগে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের কর্মীরা তাদের প্রতিমাসের বেতনের এক শতাংশ টাকা জমিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘অধ্যাপক শরীফ হোসেন শিক্ষাবৃত্তি তহবিল’।

এর আওতায় ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে অধ্যয়নরত ১৩৬ জন দরিদ্র-মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের দায়িত্ব নিয়েছে সংস্থা। প্রায় ৪৩ লক্ষের বেশি পরিবার পাচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা। এছাড়া বিভিন্ন স্বাস্থ্যশিবিরের মাধ্যমে ১ লক্ষ মানুষের মাঝে ওষুধ বিতরণ ও সাধারণ চিকিৎসা সেবাসহ ৭৩০টি বিদ্যালয়ের ৬৮ হাজার ৩২৩ জন শিক্ষার্থীর দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, প্রায় ২৫ হাজার নারীকে বিনামূল্যে শল্যচিকিৎসাসেবা প্রদান।

টিকা ও বিভিন্ন পুষ্টি গুণাবলীসম্পন্ন খাদ্যসামগ্রি প্রদান, সুষম খাবার রান্না এবং সবজি চাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ অপুষ্ট শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের সেবা প্রদান। ২০১৯ সালে কোভিড পরিস্থিতিতে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ পরিবারকে বিভিন্ন উপকরণ ও ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ও আধুনিক সরঞ্জাম এবং উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। প্রায় ৪ লক্ষ সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা দেয়া হয়েছে।

পেশাদার সমাজকর্মী হয়েও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তার রয়েছে সযত্ন প্রয়াস। শিশু নিলয়, যশোর নৈশবিদ্যালয়, নাজির শংকরপুর শিশুস্বর্গ প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারুপীঠ, এডাব-যশোর চ্যাপ্টার, ভিএইচএসএস-ঢাকা, ফেডারেশন অব এনজিওস ইন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সিল্ক ফাউন্ডেশন এবং দেশের দক্ষিণ-পশিচমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও সক্রিয় নারী উন্নয়ন সংগঠন ‘জয়তী সোসাইটি’সহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরজুর নামটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এছাড়া জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

জাগরণের পথে, আমরাও মানুষ, বোকা বলেই গরিব, শব্দজ্ঞান, আমাদের দাবি মানতে হবেসহ বয়স্ক ও শিশুশিক্ষার বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা, প্রকাশ, প্রচার ও প্রয়োগে তার অবদান শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। আজাদুল কবির আরজুর প্রকাশিত কবিতার বই ‘বাউল হৃদয়’। সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া এই মানুষটি মৃত্যুর পর তার নশ্বর দেহটিও দান করেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার জন্য।

*** বর্তমানে বন্ধ আছে।

Share.
Exit mobile version