কোটচাঁদপুর সংবাদদাতা
চাঁদকাহন জয় করেছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের ৭ শিক্ষার্থী। তারা সবাই কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। মহাকাশ গবেষণায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরপর দুটি সাফল্য দেখাল ওই স্কুলের ছাত্ররা।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল স্পেস সোসাইটি (এনএসএস) আয়োজিত ২০২৪ সালের ‘লিভিং ইন আ হেলদি স্পেস’ শীর্ষক বৈশ্বিক ডিজাইন প্রতিযোগিতায় নবম গ্রেড (বড় দল) ক্যাটেগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ছয় শিক্ষার্থী।
এবার একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চাঁদে মানুষের বসবাসের উপায় দেখিয়ে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থী হইচই ফেলে দিয়েছে। প্রতিযোগিতায় দশম গ্রেডে অংশ নেয়া ২৫২ দেশকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেছে তারা।
চাঁদে বসতি স্থাপনে তিনটি বিষয়ে গবেষণা করে ওই প্রতিবেদন লিখেছে কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী খাজা আতিফ আবিদ, তসলিম উদ্দিন, আরেফিন সিদ্দিকী, ওমর ফারুক আল সাবিত, তাওফিক আহমেদ, তাসলিম আহমেদ ও মুনতাসির রহমান বিশ্বাস। তাদের লেখা প্রতিবেদনটির নাম ছিল ‘অ্যা ভিশন অব হারমোনি, হেলথ অ্যান্ড প্রগেসেস’। শিক্ষার্থীরা জানায়, এটি লিখতে তাদের এক বছর সময় লাগে।
প্রতিবেদনটি লেখার বেশির ভাগ সময় তারা একসঙ্গে কাটিয়েছে বিদ্যালয়ের ল্যাবে। ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি তারা এ কাজটি করে। ইতোমধ্যে ন্যাশনাল স্পেস সোসাইটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশের মাধ্যমে সাত শিক্ষার্থীর প্রতিবেদনটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মহাকাশ গবেষণা বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য।
প্রতিবেদনে তারা দেখিয়েছে, ভবিষ্যতে চাঁদে বসতি গড়ে তুলতে হলে থাকা-খাওয়া, চাষাবাদসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক উপায়। যার মধ্যে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিনন্দন ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান।
এই প্রকল্পটির বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থাপনা হলে, ভবিষ্যতে মহাকাশ অভিযানের জন্যও একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করে গবেষক শিক্ষার্থীরা।
গত বছরের ২১ নভেম্বর লিভিং ইন এ হেলদি স্পেস প্রতিযোগিতায় পাঠানো প্রতিবেদনটির ফল প্রকাশিত হয় গত ৩১ জানুয়ারি এনএসএসের ওয়েবসাইটে। সেখান থেকেই তারা জানতে পারে দশম গ্রেডে প্রথম হওয়ার বিষয়টি।
শিক্ষার্থী খাজা আতিফ আবিদের বাসা কোটচাঁদপুর বাজেবামনদহের টিঅ্যান্ডটি পাড়ায়। বাবা কে এন ওয়াহেদুল আলম ও মা আসমা খাতুন। আবিদ জানায়, ২০২৪ সালে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের শিার্থীদের সাফল্য তাকে অনুপ্রাণিত করে। এর পরই তার কাসের ছয় বন্ধুকে নিয়ে গঠন করে গবেষণা দল।
কীভাবে কাজ করবে-জানতে চাইলে আবিদ বলে, এটি একটি গবেষণাভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী চন্দ্র বসতি পরিকল্পনা। যার লক্ষ্য চাঁদের কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি, নিরাপদ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ মানব বসতি গড়ে তোলা।
এই প্রকল্পে প্রথমে ৭০ হাজার মানুষের বসবাসের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে এক লাখ ৩০ হাজার পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব। আমরা পুরো স্থাপনাটি দুটি বৃহৎ ষড়্ভুজ কাঠামো এবং একটি কেন্দ্রীয় টাওয়ার নিয়ে নির্মিত দেখিয়েছি।
এর কেন্দ্রীয় অংশ শক্তি সরবরাহ, বায়ু নিয়ন্ত্রণ, পানি বণ্টন এবং তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
এটির নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ছোট সংযোগকারী পডের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন অংশ যুক্ত করা যায়। ফলে পরে কাঠামো পরিবর্তন না করেই বসতিকে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
আবিদ জানায়, এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরাটাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। এনএসএস আমাদের দুটি সনদ দেবে। একটি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকারের, আরেকটি ন্যাশনাল স্পেস সোসাইটিতে যোগদান করে প্রতিবেদন উপস্থাপন করার জন্য।
যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী জুনে ওয়াশিংটনে। আমার জানা মতে এর আগে যারা ওই প্রতিযোগিতায় গিয়েছিলেন, তাদের এনএসএস থেকেই মোট ব্যয়ের অর্ধেক টাকা দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু আমাদের এখনও এমন কিছু জানানো হয়নি। সেখানে যেতে না পারলে আমাদের সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে। ওয়াশিংটন যেতে অনেক টাকা লাগবে। তারপরও আমরা পাসপোর্ট করার কাজ শুরু করেছি। ওই সম্মেলনে অংশ নিতে আমরা সরকার তথা সংশ্লিষ্টদের কাছে সহায়তা চাই। আবিদের দলের আরেক সদস্য তসলিম উদ্দিন চুয়াডাঙ্গা জীবননগর সরকারি আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক এসএম সালাহউদ্দিনের ছেলে।
মা কোটচাঁদপুর পৌর মহিলা কলেজের প্রভাষক রোজী আকতার। তারা কোটচাঁদপুর বাজার পাড়ার বাসিন্দা। আরেক সদস্য আরেফিন সিদ্দিকীর বাবা সংবাদকর্মী কামরুজ্জামান সিদ্দিকী ও মা খালিশপুর বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ফারজানা নাহিদ। কোটচাঁদপুর বন বিভাগ পাড়ায় বসবাস করেন তারা।
দলের আরেক সদস্য ওমর ফারুক আল সাবিত কোটচাঁদপুর আদর্শপাড়া তালসার সড়কের শিক্ষক দম্পতি শরিফুল ইসলাম ও আসমা খাতুনের ছেলে। শিক্ষার্থী মুনতাছির রহমান বিশ্বাসের বাবা কোটচাঁদপুর বাজেবামনদহ টিঅ্যান্ডটি পাড়ার মৃত মশিয়ূর রহমান বিশ্বাস ও মা রোজিনা আক্তারের ছেলে।
আর তাওফিক আহমেদ ও তাছলিম আহমেদ হলেন উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ফারুক আহাম্মেদ ও মা নাজনীন সুলতানার ছেলে। সাত শিক্ষার্থীর এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাদের সহপাঠী ও শিক্ষকরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজুর রহমান বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের ছেলেরা নিরলস পরিশ্রম করে দেশ তথা বিশ্ব জয় করেছে। এতে আমরা যেমনি গর্বিত, তেমনি গর্বিত কোটচাঁদপুরবাসী।
আমি তাদের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি। এ বিষয়ে কোটচাঁদপুরের ইউএনও এনামুল হাসান বলেন, আমাদের ছেলেরা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্পেস সোসাইটি আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সাফল্য বয়ে এনেছে।
এটা থেকে বোঝা যায়, আমাদের ছেলেমেয়েরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছে। তাদের এ সাফল্য কোটচাঁদপুরবাসীর জন্য গর্ব।
সামনের দিনে এ ছেলেরা যেন প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে পারে এবং দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে তার জন্য আমাদের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
