বাংলার ভোর প্রতিবেদক
কখনো পৌর শহর, কখনো বা প্রত্যন্ত অজপাড়াগাঁয়ে। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এ-বাড়ি, ও-বাড়ি। কখনো গাড়িতে, কখনো হেঁটে চলছে গণসংযোগ। সকাল কিংবা গভীর রাত পর্যন্ত প্রচারপত্র বিলি, পথসভা করে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী সাবিরা সুলতানা। খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে তিনিই বিএনপির একমাত্র নারী প্রার্থী।
সাবিরা সুলতানা ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। আসনটিতে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে জামায়াতের প্রার্থী মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ লড়াই করছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও যশোর জেলা বিএনপির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক নাজমুল ইসলাম ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাত পৌনে বারোটার দিকে মোহাম্মদপুর থানার পাশ থেকে ব্যক্তিগত গাড়িসহ অপহৃত হন। পরদিন ১৫ ডিসেম্বর ভোরে গাজীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ সালনা এলাকার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশ থেকে নাজমুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করে গাজীপুর থানা পুলিশ।
তখন তার স্ত্রী সাবিরা সুলতানা ছিলেন একজন গৃহবধূ। পরে নাজমুলের শূন্যতা পূরণ করতে সাবিরা রাজনীতিতে নাম লেখান। সেই শুরু থেকে কখনো রাজনীতি না করা গৃহিনী সাবিরা আজ হয়ে উঠেছেন পোক্ত রাজনীতিক। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। এক বছর মেয়াদ থাকলেও তিনি আর চেয়ারে বসতে পারেননি। নাজমুল সাবিরা দম্পতির তিনটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে আমেরিকায় চাকরি করেন। মেজো ছেলে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ছেন আর ছোট ছেলে ঢাকাতে পড়াশোনা করেন।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার রাজনীতিতে খুবই জনপ্রিয় ও নির্ভার ছিলেন প্রয়াত নাজমুল। স্বামীর মৃত্যুর পরে সেটিই ধরে রেখেছেন তার স্ত্রী সাবিরা নাজমুল। অনেকেই তাকে মুন্নী ভাবী নামেই চেনে। নির্বাচনী প্রচারে বেশ সাড়া পাচ্ছেন দাবি করে সাবিরা সুলতানা বলেন, ‘মানুষের ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ। প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষের সঙ্গে আমার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছে। দীর্ঘদিন দেশে সুষ্ঠু ভোট না হওয়ায় অনেক ভোটারের মধ্যে অনীহা আছে। এ কারণে তিনি ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।’
শুক্রবার সকাল থেকেই প্রচারণা শুরু করেন সাবিরা সুলতানা। সকাল ৯টা থেকেই ঝিকরগাছা পৌর শহরের কৃষ্ণনগরে উঠান বৈঠক করেন। এরপর ১০ টার দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরে কৃষ্ণনগর থেকে পৌর শহরে প্রচারপত্র বিলি করেন। এ সময় কয়েকজন নার কে তাকে জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়। বয়স্কদের সাবিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দিতেও দেখা গেছে। কৃষ্ণনগরে উঠান বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছিলেন বিএনপির এই প্রার্থী।
ফ্যামিলি কার্ড দেখিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটা পরিবারের নারী সদস্যের নামে একটি করে এই কার্ড দেয়া হবে। যে কার্ডের মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল, লবণ, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ ১২ ধরনের পণ্য দেয়া হবে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন হবে। পুরুষেরা ইচ্ছা করলেই নারীকে আর অবহেলা করতে পারবে না’। কৃষক কার্ডের নমুনা দেখিয়ে সাবিরা সুলতানা বলেন, ’পুরুষদের জন্যও কৃষক কার্ড রয়েছে।
এই কার্ডের মাধ্যমে ফসল ফলানোর জন্য সার-বিজসহ অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা হবে। যা কৃষকের পরিবারে স্বচ্ছলতা নিয়ে আসবে। এছাড়া চিকিৎসা সেবার জন্য পৃথক কার্ড করা হবে। যে কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবায় ৫০ শতাংশ ছাড় অথবা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে।
এছাড়া নিবন্ধিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে যারা ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ নিয়েছেন। সরকার থেকে সে টাকা মওকুফ করা হবে’। বক্তৃতা শেষ হতেই কয়েক তরুণীরা তার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। ছবি তুলতে চান। সাদরে তাদেরকে কাছে নিয়ে সাবিরা সুলতানা ক্যামেরা ডেকে ছবি তোলেন। ছবি তুলে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন।
পাশেই একটি চায়ের দোকানে প্রবেশ করে বৃদ্ধাদের কাছে দোয়া চাইছিলেন। তাদের শারীরিক খোঁজ খবর নেয়ার পাশাপাশি দিচ্ছিলেন এলাকার নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। একপর্যায়ে গাড়িতে ওঠার আগে কয়েকজন নারীদের হাতে তার প্রচারপত্র তুলে দিয়ে বলছিলেন, স্বামী হারানোর করুণ কথা।
তিনি (সাবিরা) বলছিলেন, আমার স্বামী নাই, সন্তানেরাও এতিম। আপনারাই আমার স্বজন। একপর্যায়ে এক নারীর কোলে থাকা শিশুকে নিজের কোলে তুলে নেন তিনি। এরপর এলাকার উন্নয়নে ধানের শীষে ভোট চেয়ে অন্য কোন পথসভায় যোগ দেয়ার জন্য চলে যান তিনি।
এভাবেই প্রচারণার শুরুর দিন থেকেই নারী-শিশুদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলা নিয়ে যশোর-২ আসন। আসনটিতে সাবিরা সুলতানা ছাড়াও জামায়াতের মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, ইসলামী আন্দোলনের ইদ্রিস আলীসহ ৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
