বাংলার ভোর প্রতিবেদক
সাইকেল-ভ্যানের উপর থরে থরে সাজানো বাহারি সব ফুল। কারও কাছে গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা; কারও কাছে জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা। কেউ বা বাঁশের ঝুড়ির ভিতরে এনেছেন গাঁদা। দরদামে পোষালেই দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা সেই ফুল কিনছেন। অগ্রহায়ণের শীতের সকালে ফুল বেঁচাকেনার এই দৃশ্য ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গাদখালী বাজারের। যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের গা ঘেসেই বসে এই ফুলের বাজার। বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবস উপলক্ষে বড় হাট ছিলো শনিবার। চাহিদা থাকায় অন্যান্য দিনের চেয়ে এদিন ফুলের সরবারহ বাড়ে কয়েকগুণ। ফ্লাওয়ার্স সোসাইটি নেতৃবৃন্দ বলছেন, গাঁদা ফুল ছাড়া বর্তমানে সব ধরনের ফুলের দাম বেশি। দুটি দিবসকে ঘিরে দুই কোটি টাকা ফুল বেঁচাকেনা হয়েছে। আশা করছেন, এবারের অতিবৃষ্টির ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবেন তারা।

শনিবার বাজারের সবচেয়ে বেশি আসে গাঁদা ফুল। মান ভেদে দুই শ’ থেকে চার শ’ টাকা পর্যন্ত প্রতি হাজার বিক্রি হয়েছে। চন্দ্রমল্লিকা ২ টাকা পিস, জারবেরা ১৬-১৮ টাকা পিস, গ্লাডিওলাস ১৬-২০ টাকা পিস, রজনীগন্ধা ১০-১৪ টাকা পিস, গোলাপ ৮-১০ টাকা পিস ও ভুট্টা ১৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। খালেদুর রহমান টিটু নামে এক ফুলচাষি বলেন, ‘১০ কাঠা জমিতে গাঁদা ফুল চাষ করেছি। কয়েক মাস ধরে সেচ, সার কিটনাশক দিয়ে পরিচর্যা করেছি এই বিজয় দিবস ও বুদ্ধিজীবী দিবসে বিক্রি করবো বলে। কেননা, অন্য ফুলের চেয়ে এই দুই দিবসে গাঁদা ফুলের চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু আশানারূপ দাম পাইনি।

গাঁদা ছাড়া সব ফুলের দাম বেশি।’ সকাল ছয়টায় ৬০০ গোলাপ নিয়ে গদখালী বাজারে আসেন ফুলচাষি আনারুল ইসলাম। সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে ৫০০ গোলাপ গড়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বাকি ১০০ গোলাপের একটি আঁটি বিক্রির আশায় অপেক্ষা করছিলেন তিনি। বিক্রি না হওয়াতে শেষ পর্যন্ত সাইকেলে করে বাড়ি যেতে দেখা গেছে তাকে। যাওয়ার আগে তিনি জানালেন, আগামীকাল দাম বাড়তে পারে; তাই বিক্রি করেননি তিনি।

সৈয়দপাড়ার চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বিঘাতে রজনীগন্ধা চাষ করেছি। আজ ৯০০ রজনীগন্ধা এনেছি। ১৪ টাকা পিস দরে বিক্রি করেছি। ভালো দাম পাচ্ছি। গতকাল ৯ টাকায় বিক্রি করেছি। সামনে আরো দাম বাড়বে।’

গত কয়েক মাস ক্ষেতে ফুল পরিচর্যা শেষে বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবসকে ঘিরে আশানুরূপ দাম পেলেও এবার চাষিদের লক্ষ্য ইংরেজি নববর্ষ, বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখলেও সামনে জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। রাজনৈতিক অস্থিরতা না হলে বিগত সময়গুলোর চেয়ে এবার কয়েকগুণ লাভে ফুলবেঁচাকেনায় আশাবাদী বলে জানিয়েছেন ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা।

গদখালী ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি মঞ্জুর আলম বলেন, এখানকার চাষিরা বিভিন্ন দিবসকে লক্ষ্য করে ফুল উৎপাদন করেন। এবার বাজার ইতোমধ্যেই রমরমা হয়ে উঠেছে। এবার মাঠে মাঠে গাঁদা ফুলের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন হয়েছে কয়েকগুণ বেশি। ফলে এবার গাঁদা ফুল ছাড়া সব ধরনের ফুলের দাম উর্ধমুখি। তারপরও আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিলাম দুই কোটি টাকা সেই ফুল বিক্রি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

প্রসঙ্গত, কৃষি বিভাগের তথ্যমতে যশোরে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ১১ ধরনের ফুলের চাষ হয়। বছরজুড়ে ফুলের চাষ হলেও ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত মূল মৌসুম। এই চার মাসে অন্তত ৭-৮টি দিবসে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ কোটি টাকার ফুল বেঁচাকেনার টার্গেট স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের।

Share.
Exit mobile version