রামপাল সংবাদদাতা
রামপালে আলোচিত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফরহাদ আলীকে অবশেষে তাৎক্ষণিকভাবে বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে। দুর্নীতি আর অনিয়মে আকুণ্ঠ নিমজ্জিত ওই কর্মকর্তাকে ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলায় বদলি করা হয়।

বিভিন্ন খাত থেকে মোটা অংকের টাকা লুটপাট ও শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষা ব্যাবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় সৃষ্টি হয়। তদন্তের সার্থে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

শিক্ষা কর্তা ফরহাদ আলী কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই শুরু করেন স্বেচ্ছাচারিতা। তার কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিকার ও শাস্তির দাবি জানিয়ে বাগেরহাট জেলা শিক্ষা অফিস বরাবর দরখাস্তের পর তদন্তও শুরু করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।

শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার ১২৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অধিকাংশ বিদ্যালয়ই প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণের সাথে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের অন্তঃকোন্দল প্রভাব ফেলেছে শিক্ষাঙ্গনে। তিনি ঘুষ, দুর্নীতি ও ভয়ভীতিসহ শিক্ষকদের রাখেন নানাবিধ আতংকের মধ্যে। তার কথার অবাধ্য হলেই শাস্তি হিসেবে পেতে হয় শোকজ লেটার। যা পরে রূপ নেয় বখশিসে। থেমে যায় ওই শোকজ লেটার।

প্রতি বছর সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ)’র জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দকৃত ওই টাকা থেকে ১৫% হারে ভ্যাট ও আইটি কর্তন করে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দিতে হয়। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ফরহাদ আলী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২০ ভাগ হারে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসারদের মাধ্যমে অগ্রিম নগদ টাকা উত্তোলন করেন। যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ লক্ষ ৮৯ হাজার ৩০৪ টাকা। আর সরকারি কোষাগারে জমা দেন ৯ লাখ ৫৩ হাজার ৭৭১ টাকা। এক্ষেত্রে লোপাট করেন ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার ৫৩৩ টাকা।

এছাড়াও সরকারি নির্দেশনা ছাড়া প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর পরীক্ষা নিতে ৩টি প্রশ্নে প্রতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হয় ১২ টাকা করে। যার আনুমানিক খরচ মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা। অর্থাৎ জন প্রতি বাড়তি আদায় করা হয় ৮ টাকা করে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে ওই শিক্ষা কর্মকর্তা মোটা অংকের টাকার বিনিময় সুখেন্দু অধিকারী নামের এক সহকারী শিক্ষককে প্রতিবন্ধি দেখিয়ে বদলি করেছেন। ওই শিক্ষক সড়ক দুর্ঘটনায় সামান্য আহত হলেও তাকে প্রতিবন্ধি দেখিয়ে বদলির আবেদন করলে কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বদলি করেন তিনি। অথচ নিয়মঅনুযায়ী সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রথমে প্রতিবন্ধির প্রত্যয়ন নিতে হবে, তবেই ওই ব্যক্তিই প্রকৃত প্রতিবন্ধি বলে বিবেচিত হবেন। তৎকালীন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ওই শিক্ষকের আবেদনটি ত্রুটিপূর্ন বলে সত্যায়িত করলেও অদৃশ্য ক্ষমতা বলে মো. ফরহাদ আলী ওই শিক্ষককে বদলি করেন।

অভিযোগ রয়েছে ওই শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ফারুকুল ইসলাম ও সরোজ কুমার রায়সহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস আসেন না। অথচ পরবর্তীতে হাজিরা খাতায় সই করে দেখান তারা অফিস করেন নিয়মিত। এছাড়াও প্রাথমিক ওই শিক্ষা কর্মকর্তা বিভিন্ন শিক্ষকদের পূর্ববর্তী কর্মস্থলে যোগদান দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া, বিভিন্ন দিবসে প্যানা বাবদ ৫ শত করে টাকা নেয়া (যার খরচ আনুমানিক ২৪০টাকা)।

অভিযোগ রয়েছে রামপাল সদর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান ও তার স্ত্রী ভাগা বেতকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নিলুফারসহ বেশ কয়েকজন তার দুর্নীতিতে সহায়তা করেন।

রামপাল উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও উত্তর হুড়কা সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক ইজাদুল হক, বাইনতলা কাশিপুর সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক তাপস পাল, দেবীপুর সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক মাহমুদ হোসেন, মুজিবনগর সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক হাওলাদার জাকির হোসেন, ভুঁইয়ার কান্দন সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক মনিরুল ইসলাম, পশ্চিম গোবিন্দপুর সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক সখিনা আক্তার, চাকশ্রী সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক কাজী মোহাম্মদ আলী ও ঝনঝনিয়া সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক খান হায়দার আলী জানান, রামপালে শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের এই অন্তঃকোন্দল প্রভাব ফেলেছে শিক্ষাঙ্গনেও।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ফরহাদ আলী সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি মানসিকভাবে খুবই দুর্বল। পারিবারিক নানা সমস্যায় আমি চিন্তিত। আমি দায়িত্ব নিয়ে আমার দায়িত্ব পালন করি। অর্থ আত্মসাৎ বা শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ এটা আমি কখনোই করিনি। আমি চেষ্টা করেছি শিক্ষাঙ্গনে আরো উন্নতি করার। সেক্ষেত্রে অনেক সময় আমি হার্ড হয়েছি, হয়তো তখন কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারে। তবুও আমার কর্মকাণ্ডে কেউ কষ্ট বা ব্যথিত হলে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।

এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, একটি বেনামী দরখাস্ত পেয়েছি। সেই বিষয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ নেই। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Share.
Exit mobile version