রেহানা ফেরদৌসী
নফস শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘আত্মা’ বা ‘সত্তা’। একে ‘প্রবৃত্তি’ও বলা যায়। নফস আমাদের মন্দ কাজের দিকে প্ররোচিত করে। পবিত্র কোরআনে নবী ইউসুফের (আ.) বক্তব্য রয়েছে, ‘আমি আমার নফসকে পবিত্র মনে করি না, নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজ প্রবণ’(সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)। নফসকে তার ইচ্ছানুযায়ী চলতে দেওয়া বিপজ্জনক, কারণ এটি চাহিদার মাত্রা আরও শক্তিশালী করে এবং আমাদের সংযমের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ইসলামে নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা রয়েছে।
নফসকে নিয়ন্ত্রন করার কার্যকর উপায় ঃ নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা কোন মানুষের পক্ষেই সহজ নয়, তবে ইসলামের দৃষ্টিকোন থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় রয়েছে যেগুলো মেনে চললে নফসকে দমন করা ও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

* সালাত (নামাজ) : নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মানুষকে অন্যায়, অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে রক্ষা করে (সুরা আনকাবুত-৪৫)।

* রোজা (সিয়াম) : রোজা কেবল ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য নয়, বরং নফসকে নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ।এটি তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম(সুরা বাকারা-১৮৮।

* কুরআনের সংস্পর্শে থাকা : দৈনন্দিন কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বুঝে পড়া নফসকে প্রশমিত করে এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। “নিশ্চয়ই আল্লাহর জিকিরে অন্তর-প্রশান্ত হয়”(সূরা রাদ: ২৮)। প্রতিদিন নিয়মিত কোরআন পড়ার অভ্যাস করতে হবে। হতে পারে ১ রুকু থেকে ১ পারা- যেকোনো পরিমাণ। প্রতিদিন হিফজের একটা টার্গেট নেওয়া যায়। এটি প্রতিদিন এক আয়াতও হতে পারে। কিন্তু টার্গেট পুরা করতে হবে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

* সুন্নাহ মেনে চলা : নফস নিয়ন্ত্রণে সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করা খুবই কার্যকর একটি উপায়। নবীজি (সাঃ) এর জীবনধারা আমাদের শৃঙ্খলার পথ দেখাবে। সুন্নাহ মেনে খাওয়া, ঘুমানো, সাজসজ্জা এবং যিকির করা হলে নফস আল্লাহর পথে থাকবে। নিয়মিত সুন্নত নামাজ, দোয়া এবং যিকির নাফসের অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছা কমিয়ে দেবে। নবীজি (সাঃ)বলেছেন, ‘যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২,৬৭৮)

* তাহাজ্জুদ : রাতে একাকী আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো আত্মার জন্য ওষুধ। এটি নফসকে নিয়ন্ত্রনে বিশেষ উপকারী। (সুরা ইসরা-৭৯)

* জিকির ও আত্মসমালোচনা : নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহকে স্মরণ (জিকির),তাওবা ও নিজের ভুল বিশ্লেষণ করা নফসের অহংকার ভাঙ্গে।

* পরিমিত খাদ্যাভাস : অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করে হালাল ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে,কেননা শরীর ভালো থাকলে মনও নিয়ন্ত্রিত থাকে।

* শরীরচর্চা : নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা যেকোন শারীরিক কসরত মানসিক চাপ কমায়, ইচ্ছাশক্তি বাড়ায়। ফজরের পরে কিছুক্ষণ ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে। আর কিছু না পারলে ১৫-২০ মিনিট জগিং করে এসে গোসল করে ইশরাকের সালাত পড়ার অভ্যাস করা।

* সৎ সঙ্গ : আল্লাহভীরু, ইতিবাচক মানুষদের সাথে থাকলে নফস সঠিক পথে থাকে। সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।

* নিজে নিজেকে পুরস্কৃত করা : ছোট ছোট জয় উদযাপন করা, যাতে মনোবল বেড়ে যায়।

* জ্ঞানার্জন : নিয়মিত পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জন করা।

* অতিরিক্ত সামাজিকতা নিয়ন্ত্রণ : সামাজিক মেলামেশা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে তা মধ্যপন্থায় হওয়া উচিত। উপকারী সঙ্গী ছাড়া অন্যদের সঙ্গে মেলামেশায় সতর্ক থাকা উচিত। ইমাম ইবনে কাইয়্যিম বলেন, ‘অতিরিক্ত সামাজিকতা হৃদয়কে দূষিত করে।’ (মাদারিজ আস-সালিকিন)অতিরিক্ত মেলামেশা আমাদের ইবাদত ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের সময় কমিয়ে দেয়।

* অবাস্তব কল্পনা পরিহার : ‘তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তা করে না, নাকি তাদের হৃদয়ে তালা লাগানো?’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২৪) ধরুন, কেউ তার জীবনের পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ করে এবং কল্পনা করে যে সবকিছু ভিন্ন হলে ভালো হতো।এই কল্পনা তার ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতাবোধকে নষ্ট করে। তাকে সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর পরিকল্পনা ভাবতে হবে। বরং প্রতিদিন আল্লাহর শোকর আদায় করতে হবে, তা ব্যক্তি যে-অবস্থাতেই থাকুন না কেন। এতে অবাস্তব ইচ্ছা কমে আসবে।

* আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি আসক্তি ত্যাগ : আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি (যেমন অর্থ, চাকরি বা মানুষ) থাকলে মনোবল দুর্বল হয়ে যায়। কোরআন বলে, ‘যারা ঈমান এনেছে, তাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা‘দ, আয়াত: ২৮)

* নিয়ত নবায়ন করতে হবে : নফস নিয়ন্ত্রণে সফলতা আল্লাহর অনুমতির ওপর নির্ভর করে। নবীজি (সাঃ)বলেছেন, ‘প্রতিটি কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)প্রতিটি কাজের আগে নিয়ত যাচাই করতে হবে যে এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। খাওয়ার আগে বলতে হবে, ‘আমি খাচ্ছি যেন আমার শরীর সুস্থ থাকে এবং ইবাদতের শক্তি পাই।’ এভাবে হলে নিয়ত নফসকে আল্লাহর পথে রাখবে।

এছাড়াও
* ইশরাকের সালাত আদায়ের অভ্যাস করুন। নিয়মিত ইশরাক নামাজ পড়া আত্মশুদ্ধির জন্য খুবই কার্যকর।

* নেতিবাচক, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও গীবত থেকে দূরে থাকতে হবে। কোনো মন্তব্য করার আগে একবার চিন্তা করতে হবে..এই কথাটা না বললে কি কোনো ক্ষতি আছে? বলা কি আবশ্যক? উত্তর না হলে, ওই কথা বলার প্রয়োজন নেই।

* মনোরঞ্জন ও অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কম দেখা, যাতে মন বিভ্রান্ত না হয়।

 

* ফজরের পর ঘুম এড়িয়ে সকালের শুরুটা কাজে এবং ইবাদতে ব্যয় করা। ফজরের নামাজ কায়েম করার পর না ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে। প্রয়োজনে কাইলুলা (দুপুরের হালকা ঘুম) করা যাবে। ঘুমের পরিমাণ কমাতে হবে।

* সকালের নাস্তা রাজার মত, দুপুরের খাবার প্রজার মতো আর রাতের খাবার ভিখারীর মতো খাওয়া। প্রতিবেলা খাবার সময় যেটুকু খাবার যথেষ্ট বলে মনে হবে তার থেকে একটু কম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে।

* সকালের নাস্তার ৩০ মিনিট পর ও রাতে ঘুমানোর আগে ২ মিনিট ধরে উত্তমরূপে দাঁত ব্রাশ করা। অবশ্যই ব্রাশটি দুই মাসের বেশি ব্যবহার না করা।

* যাত্রার সময় অস্বাস্থ্যকর খাবার (ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া) এড়ানোর জন্য ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার, খেজুর, বাদাম পানি সাথে রাখা।

* আল্লাহর কাছে নিয়মিত নিজের হেদায়েত এর জন্য দোয়া করা।“হে অন্তরের পরিবর্তনকারী, আমাদের অন্তরকে তোমার দ্বীনে অটল রাখো”(তিরমিজি -৩৫২২)

* রাতে অন্তত নিñিদ্র ছয় ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ডাক্তার থেকে পরামর্শ করে নেওয়া।

* দৈনিক পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা

* ভাল কাজে সদা ব্যস্ত থাকা। কেননা অলস সময় নিকৃষ্ট শত্রু “অতএব যখনই অবসর পাও, তখনই (আল্লাহর ইবাদাতে) সচেষ্ট হও ”(আশ শাহর-৭)।

* দৃষ্টি অবনত রাখতে হবে। না পারলে তা এড়িয়ে চলার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

* রাতে ঘুমানোর পূর্বে অযু করে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে নিয়ে এবং ঘুম না আসা পর্যন্ত আসতাগফিরুল্লাহ পড়তে থাকতে হবে।

নফস সবসময় চায় স্বস্তি, আর রুহ চায় সংঘম। নফসকে জয় করতে হলে শুধু জ্ঞান নয়, লাগবে চর্চা, তাকওয়া ও ধারাবাহিকতা। এই পথ কঠিন হলেও আল্লাহর জন্য করলে..তিনি তা সহজ করে দেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ পাক কোরআন এর প্রতিটি কথার ওপর আমাদের সবাইকে এবং সঙ্গে আমাকেও আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক)

Share.
Exit mobile version