হিমেল খান
আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে আবারও জলাবদ্ধতার শঙ্কায় রয়েছেন যশোরের ভবদহ অঞ্চলের মানুষ। জলাবদ্ধতা নিরসনে গত বছর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী খননের কাজ উদ্বোধন করা হলেও কাজের ধীরগতির কারণে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। ভবদহবাসীর আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে, আগামী বর্ষা মৌসুমেও পুরো এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় যশোর শহরের নীলরতন ধর রোডে অবস্থিত ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আশঙ্কার কথা জানান সংগঠনের নেতারা।  সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা তসলিম উর রহমান, সদস্য জিল্লুর রহমান ভিটু, সদস্য সাধন বিশ্বাস, রাজু আহমেদ প্রমুখ।

যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরার অংশ নিয়ে গঠিত ভবদহ অঞ্চল দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতার ভুগছে এ অঞ্চলের মানুষ।  প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে এ অঞ্চলের মানুষ। বাড়ির উঠানে হাঁটুসমান পানি জমে থাকে, চারপাশে শ্যাওলায় ভরা পরিবেশে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের। ফলে বছরের অধিকাংশ সময়ই জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হন তারা। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্থ হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এই সমস্যা সমাধানে গত বছর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৮১ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় অভয়নগরের ভবদহ ২১ ভেন্ট স্লুইসগেট  থেকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদীর ১৫ কিলোমিটার, কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদীর ৫ কিলোমিটার, মণিরামপুরের বাকোশপোল থেকে কেশবপুরের বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদীর ৩৫ কিলোমিটার, বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগরের গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১ ভেন্ট স্লুইসগেট পর্যন্ত টেকা নদীর ৭ কিলোমিটার এবং মণিরামপুরের নেহালপুর বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটার শ্রী নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে প্রকল্পের কাজের ধীরগতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।

ভবদহ এলাকার বাসিন্দা ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব চৈতন্য পাল বলেন, খনন কাজ শুরু হলেও অনেক স্থানে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা।

সংগ্রাম কমিটির সদস্য অনিল বিশ্বাস বলেন, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্যসম্বলিত কোনো সাইনবোর্ড অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে না। ফলে নদীর গভীরতা ও প্রস্থ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্পষ্ট ধারণা নেই। সামনে বর্ষা মৌসুম থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে হলে আরও বেশি সংখ্যক স্কেভেটর নিয়োগ করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর মূল স্রোতধারায় জমে থাকা পলি দ্রুত অপসারণ না করলে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

একই এলাকার বাসিন্দা শিব পদ বিশ্বাস বলেন, দ্রুত নদীগুলোতে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প চালু করা জরুরি। তা না হলে দুই-এক বছরের মধ্যেই নদীগুলো আবার পলিতে ভরাট হয়ে যাবে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে করা খননকাজের সুফল নষ্ট হয়ে যাবে।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, নদী খননের কাজে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে টিআরএম প্রকল্প ছাড়া শুধু নদী খনন করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে না। তিনি অভিযোগ করেন, টিআরএম প্রকল্প বাদ দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন করে পাঁচটি সেচ পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে স্থায়ী সমাধান তো হবেই না, বরং আগামী মৌসুমেও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থেকে যাবে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানিয়েছেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখেই পর্যায়ক্রমে নদী খননের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আপৎকালীন সমাধান হিসেবে পাঁচটি সেচ পাম্প স্থাপনের প্রকল্পও  হাতে নেয়া হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তার  দাবি, এবারের বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কোন আশঙ্কা নেই।

Share.
Exit mobile version