বাংলার ভোর প্রতিবেদক
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাটে পবিত্র ঈদুল আজহা পরবর্তী দ্বিতীয় হাটেও প্রত্যাশিত পরিমাণ চামড়া আসেনি। সরবরাহ কম থাকার পাশাপাশি চামড়ার দাম নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। বাজারে চামড়ার অস্বাভাবিক কম উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সীমান্ত দিয়ে পাচারের শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন হাট সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এ হাটে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চামড়ার আমদানি ছিল অত্যন্ত কম। হাট সংশ্লিষ্টদের দাবি, এদিন বাজারে পাঁচ হাজার চামড়াও ওঠেনি। অথচ ঈদের পর লবণজাত করা বিপুল পরিমাণ চামড়া এ সময় বাজারে আসার কথা ছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল অনেক কম। বড় ট্যানারি মালিক কিংবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বড় ব্যাপারিদের উপস্থিতিও ছিল সীমিত। স্থানীয় ও কিছু বহিরাগত ব্যবসায়ীকে অল্প পরিসরে কেনাবেচা করতে দেখা গেছে।

ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে আসা ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধি ও চামড়া ব্যবসায়ী ইউসুফ শামীম বলেন, “আমরা সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ীই চামড়া কিনছি। ভালো মানের গরুর চামড়ার ক্ষেত্রে ৮০০ টাকা রেট যথাযথ। তবে কাটিং বা বাছুরের চামড়া সরকারি রেটে বিক্রি হবে না। আমাদের কেনাকাটা চলছে, আশা করছি সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।”
তবে মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দাবি ভিন্ন। তারা বলছেন, বর্তমান বাজারদরে চামড়া বিক্রি করে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, “গ্রামাঞ্চল থেকে ১৪টি চামড়া প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকায় কিনেছিলাম। কিন্তু আজ হাটে এসে দেখছি সেই চামড়ার দাম উঠছে মাত্র ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ ধরলে বড় অঙ্কের লোকসান গুণতে হবে।”

চামড়ার কম সরবরাহের কারণ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কেউ বলছেন, এবার কোরবানির সংখ্যা কিছুটা কম হওয়ায় সরবরাহও কমেছে। আবার অনেকেই চামড়া লবণজাত করে নিজস্ব গুদাম কিংবা মাদ্রাসায় সংরক্ষণ করে রেখেছেন। ঈদের পর ছুটির আমেজে অনেকেই এখনো বাজারে চামড়া আনেননি বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ।

তবে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তাদের মতে, বিপুল পরিমাণ চামড়া বাজারে না আসার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। দেশীয় এই মূল্যবান সম্পদ যাতে সীমান্ত পেরিয়ে পাচার না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন।

রাজারহাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ বলেন, “ঈদের পর শনিবার প্রথম হাট বসেছিল। আমরা ধারণা করেছিলাম দ্বিতীয় হাটে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার চামড়া আসবে। কিন্তু সেখানে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার চামড়া এসেছে। যশোর অঞ্চলে যে পরিমাণ কোরবানি হয়েছে, তার তিন ভাগের এক ভাগ চামড়াও এখনো বাজারে আসেনি।”

সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরও বলেন, “চামড়াগুলো কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে কিংবা সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়েছে কি না-সেটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। প্রায় অর্ধকোটি টাকা দিয়ে হাট ইজারা নিয়েছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইজারার মূল টাকাই উঠবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছি।”

চামড়া খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী শনিবারের বড় হাটের ওপরই এখন দক্ষিণবঙ্গের চামড়া বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে। ওই হাটে যদি বড় ট্যানারি মালিক ও ব্যাপারিদের উপস্থিতি না বাড়ে এবং চামড়ার সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়, তাহলে হাজারো ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের চামড়া শিল্পেও পড়তে পারে।

Share.
Exit mobile version