বাংলার ভোর প্রতিবেদক

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পারবাজার বিলপাড়া এলাকায় প্রতিবেশির জমিতে জোরপূর্বক চলাচলের রাস্তা তৈরি করতে সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের মহড়া দিয়ে প্রতিবেশীর সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়।

অস্ত্রের মুখে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, থানায় অভিযোগ করার পরও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধ নয়; বরং অর্থের বিনিময়ে কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ভয়ভীতি সৃষ্টি, শক্তির প্রদর্শন এবং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ। এতে এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে।

ভিডিও দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

ভুক্তভোগী কৃষক মফিজুর রহমান জানান, দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে দুই বছর আগে বাড়ির পাশে সাত শতক জমি কিনেছিলেন।

সম্প্রতি জমির চারপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের পর প্রতিবেশী সালমা ওই জায়গা দিয়ে চলাচলের রাস্তা দাবি করেন। দাবি না মানায় অর্থের বিনিময়ে একদল কিশোর সন্ত্রাসীদের নিয়ে প্রকাশ্যে প্রাচীর ভেঙে দেয়া হয়।

তার অভিযোগ, প্রাচীর ভাঙার সময় সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র হাতে মহড়া দেয় এবং পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখায়। অস্ত্রের মুখে তিনি কিংবা পরিবারের কেউ বাধা দেয়ার সাহস পাননি।

মফিজুর রহমানের বড় ছেলে শাওন বলেন, ঘটনার পরও হুমকি থামেনি সন্ত্রাসীদের। অভিযুক্তদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন যুবক একাধিকবার তাদের বাড়ির সামনে এসে অস্ত্র প্রদর্শন করেছে। এতে পরিবারের নারী ও শিশুরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম। তিনি জানান, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া পাঁচ শতক জমির ওপর নির্মিত বাড়ির সীমানা প্রাচীরও একইভাবে ভেঙে দেয়া হয়। অস্ত্রধারীদের উপস্থিতির কারণে তিনি কোনো ধরনের প্রতিবাদ করতে পারেননি। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এ ঘটনার অনুসন্ধানে গিয়ে স্থানীয়দের ধারণ করা একটি ভিডিও চিত্র পাওয়া যায়। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন কিশোর ধারালো অস্ত্র দিয়ে সীমানা প্রাচীর ভাঙছে। অন্য একটি ভিডিওতে কয়েকজন যুবক দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ভিডিওতে ভুক্তভোগী পরিবারের অসহায় অবস্থাও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে এমন তাণ্ডব চালানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

এদিকে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযুক্তদের সাথে যোগাযোগ করলেও তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে অভিযুক্ত প্রতিবেশী সালমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চলাচলের পথ তৈরির জন্য প্রাচীর ভাঙার কথা স্বীকার করেন। যদিও এ কাজে সন্ত্রাসী ব্যবহারের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনার পর একাধিকবার ঝিকরগাছা থানায় অভিযোগ দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নিরবতায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং তারা এখনো হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া হাসান বলেন, আইন অমান্য করে প্রাচীর ভাঙার বিষয়টি তারা জেনেছেন। তবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের মহড়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। সনাক যশোরের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান মজু বলেন, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের নামে সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং ব্যবহার করে অন্যের সম্পত্তি ভাঙচুর করা আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি। আগে রাজনৈতিক বা মাদককেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার বেশি দেখা গেলেও এখন অর্থের বিনিময়ে কিশোর গ্যাংকে জমি দখল, ভয়ভীতি সৃষ্টি ও শক্তি প্রদর্শনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রবণতা বন্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় সমাজে আইনহীনতার সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করবে।

অধ্যাপক পাভেল চৌধুরী বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি বেড়েছে তাদের ভয়াবহতা। এখন তারা শুধু মারামারি বা ছোটখাটো অপরাধেই সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল তাদের ব্যবহার করে জমি দখল করছে, ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং প্রভাব বিস্তারের মতো কাজে। তিনি বলেন, প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগের সমন্বয় ছাড়া এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে প্রাচীর ভাঙা, প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী ব্যবহার এবং অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভুক্তভোগী দুই পরিবার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

 

Share.
Exit mobile version