বাংলার ভোর প্রতিবেদক
সকাল গড়াতেই যশোরের আকাশ যেন আগুন ছড়াতে শুরু করে। সূর্যের তীব্র তাপে দুপুর নামার আগেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শহরের পিচঢালা সড়ক। গরম বাতাসে যেন নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে মানুষের। প্রচণ্ড তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো জেলায়। শুধু মানুষই নয়, কষ্টে আছে গবাদিপশু, পাখি ও পথের প্রাণীরাও।
শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে খুলনায় তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও চুয়াডাঙ্গায় ছিল ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এদিকে গরমে শহরের ব্যস্ত সড়কগুলো দুপুরের পর অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। যারা জীবিকার তাগিদে বের হচ্ছেন, তাদের চোখেমুখে ক্লান্তি আর অবসাদের ছাপ স্পষ্ট। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর কিংবা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
যশোর শহরের রেলগেট এলাকায় রিকশাচালক আব্দুল কাদের মাথায় ভেজা গামছা দিয়ে বসেছিলেন এক গাছের ছায়ায়। ঘাম মুছতে মুছতে তিনি বলেন, রোদে রিকশা চালানো যায় না। শরীর পুড়ে যায়। কিন্তু না বের হলে সংসার চলবে কীভাবে?”
যশোর শহরের সার্কিট হাউজ মোড়ে ডাব বিক্রেতা জালাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে অনেক মানুষ ডাব খেতে আসছে। কিন্তু গরমে ডাবের পানিও যেন গরম হয়ে যাচ্ছে। রোদে দাঁড়িয়ে ডাব বিক্রি করতে নিজের জানই বের হয়ে যাচ্ছে।’
শহরের খড়কি এলাকার রিকশাচালক জালাল হোসেন বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে গায়ে যেন আগুনের ধাক্কা লাগছে। একটু রিকশা চালালেই ঘামে গা ভিজে যাচ্ছে। গরমে মাথা ঘুরে উঠছে। যাত্রীও পাচ্ছি কম।’
অন্যদিকে তীব্র গরমে শুধু মানুষ নয়, বিপাকে পড়েছে প্রাণীরাও। শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কুকুরগুলো জিহ্বা বের করে ছায়ায় শুয়ে আছে। অনেক পাখি পানির খোঁজে বাড়ির কার্নিশ বা গাছের ডালে এসে বসছে। খামারের গরু ও ছাগলও গরমে অস্থির হয়ে পড়েছে।
যশোর সদর উপজেলার এক খামারি জানান, অতিরিক্ত গরমে গরুর খাবার গ্রহণ কমে গেছে। অনেক পশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মুরগির খামারেও বাড়ছে মৃত্যুর আশঙ্কা। এদিকে, গ্রামের খাল-বিল ও ছোট জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশুর জন্য বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। কৃষকরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ফসল নিয়ে।
অপরদিকে, গরমজনিত নানা রোগে হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়রিয়া, জ্বর, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন, প্রয়োজন ছাড়া দুপুরে বাইরে না বের হতে, বেশি বেশি পানি পান করতে এবং শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ যত্ন নিতে।
স্বস্তির অপেক্ষায় মানুষজন। তাপদাহে অতিষ্ঠ মানুষ এখন এক পশলা বৃষ্টির অপেক্ষায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে অনেকেই বলছেন, “একটু বৃষ্টি হলে বাঁচা যেত।” কিন্তু আবহাওয়া বদলের কোনো লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়। তাই তীব্র গরমে কষ্টে থাকা মানুষ ও প্রাণীকূলের জন্য প্রতিটি দিন যেন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে, সন্ধ্যার পরপরই সামান্য বৃষ্টিতে তপ্ত রাস্তা আরো যেন তেঁতে ওঠে। সারাদিনের খরতাপে দগ্ধ সড়কগুলোতে বৃষ্টির সামান্য পানিতে উঠতে থাকে গরম বাস্প যা জনজীবনে আরো ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়।
