শিফাত আল শাফি

আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল দ্বৈরথের কথা উঠলেই অধিকাংশ ফুটবলপ্রেমীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের মেক্সিকোর এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়াম, ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’, অবিস্মরণীয় ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ এবং তার চার বছর আগে সংঘটিত ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) যুদ্ধের স্মৃতি। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস কেবল ওই কয়েকটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড় আরও গভীরে—আর্জেন্টিনায় ফুটবলের সূচনা, দুই দেশের ভিন্ন ফুটবল-দর্শন এবং সময়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায়।

আর্জেন্টিনায় ফুটবলের আগমন
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ অভিবাসী ও রেলওয়ে প্রকৌশলীদের মাধ্যমে আর্জেন্টিনায় ফুটবলের প্রচলন ঘটে। ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত শিক্ষক থমাস হগের উদ্যোগে দেশটিতে প্রথম নথিভুক্ত ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে খেলাটি ছিল মূলত ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় অভিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় আর্জেন্টাইনরা খেলাটির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ফুটবল ধীরে ধীরে দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হয়।

এর আগে ব্রিটিশদের হাত ধরেই ক্রিকেট আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেছিল। কিন্তু তুলনামূলক জটিল নিয়ম এবং সীমিত অংশগ্রহণের কারণে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পায়নি। সহজবোধ্যতা, গতি ও আবেগের কারণে ফুটবলই সাধারণ মানুষের খেলা হয়ে ওঠে।

ফুটবল দর্শনের সংঘাত
দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা হয়েছিল মাঠের খেলায় নয়, বরং ফুটবল দর্শনে। ব্রিটিশ ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক সক্ষমতা, গতি, শৃঙ্খলা এবং সরাসরি আক্রমণনির্ভর কৌশলের জন্য পরিচিত ছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবল গড়ে ওঠে বলের নিয়ন্ত্রণ, কারিগরি দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার ভিত্তিতে।

এই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ফুটবল পরিচয় ‘লা নুয়েস্ত্রা’ (La Nuestra)—অর্থাৎ ‘আমাদের নিজস্ব ধারা’। এটি কেবল একটি কৌশল নয়; বরং জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।

১৯৬৬ বিশ্বকাপ: সম্পর্কের মোড় ঘোরানো অধ্যায়
যদিও দুই দল এর আগেও একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছিল, তবে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন মাত্রা দেয়।

লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলাইনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে লাল কার্ড দেখানো হয়। ভাষাগত সমস্যার কারণে রাতিন রেফারির সিদ্ধান্ত বুঝতে পারেননি এবং দোভাষীর মাধ্যমে ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। পরে মাঠ ছাড়লেও তিনি প্রতিবাদস্বরূপ কিছুক্ষণ মাঠে অবস্থান করেন এবং মাঠের পাশে থাকা ব্রিটিশ প্রতীকগুলোর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

১০ জনের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জিওফ হার্স্টের গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় ইংল্যান্ড। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের “animals” বলে মন্তব্য করেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই ম্যাচ থেকেই আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল দ্বৈরথ স্থায়ী বৈরিতার রূপ নেয়।
ফকল্যান্ড যুদ্ধ: ফুটবলের বাইরে জাতীয় আবেগ

১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়। এতে প্রায় ৯০০ জনের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন আর্জেন্টাইন সেনা সদস্য। যুদ্ধে ব্রিটেন বিজয়ী হলেও আর্জেন্টিনার জাতীয় চেতনায় এই ঘটনা গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে যায়।
যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দেশের পুনর্মিলন ফুটবলকে অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত করে।

১৯৮৬: ম্যারাডোনার দুই গোল, ইতিহাসের দুই প্রতীক
মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকায় অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ।
ম্যারাডোনা প্রথমে হাতে বল স্পর্শ করে গোল করেন। ম্যাচ শেষে তিনি সেটিকে আখ্যা দেন—”a little with the head of Maradona and a little with the hand of God”—যা পরবর্তীতে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

মাত্র চার মিনিট পর তিনি নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচজন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোল করেন। ফিফা পরবর্তীতে এটিকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ম্যারাডোনা পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, ওই ম্যাচে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মানসিকতায় প্রভাব ফেলেছিল। যদিও ম্যাচটি আনুষ্ঠানিকভাবে ছিল একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা, অনেক আর্জেন্টাইনের কাছে এটি জাতীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে ওঠে।

১৯৯৮: বেকহাম-সিমিওনে অধ্যায়
ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। নির্ধারিত সময় ২-২ গোলে শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা।

তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড। দিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষে পা দিয়ে আঘাত করার কারণে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। ইংল্যান্ডে ফিরে বেকহাম তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন; সংবাদমাধ্যম, সমর্থক এবং জনমতের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তার ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন সময় তৈরি করে।

২০০২: ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। আগের বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে ওঠেন বেকহাম। তার পেনাল্টি থেকে করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় ইংল্যান্ড। সেই জয়কে অনেকেই ১৯৯৮ সালের হতাশার প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখেন।

পরিসংখ্যান যা বলে
ফিফা স্বীকৃত ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘ ইতিহাসে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়, যা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিযোগিতামূলক চরিত্রকে স্পষ্ট করে। বিশ্বকাপের মঞ্চেও দুই দলের প্রতিটি সাক্ষাৎ ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের দ্বৈরথের বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি কেবল দুই দলের মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই ভিন্ন ফুটবল-দর্শনের বিকাশ, জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন, বিতর্কিত রেফারিং, যুদ্ধের স্মৃতি এবং বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত।

তবে সময়ের সঙ্গে এই বৈরিতা মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই সীমিত হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়দের কাছে এটি মূলত একটি ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল লড়াই, যেখানে অতীতের ইতিহাস অনুপ্রেরণা জোগালেও ফল নির্ধারণ করে মাঠের ৯০ মিনিটের পারফরম্যান্সই।

Share.
Exit mobile version