রেহেনা ফেরদৌসী
চারদিকে ঈদের চাঁদ দেখার উচ্ছ্বাস, নতুন পোশাকের সুঘ্রাণ আর ঘরমুখো মানুষের ঢল। কিন্তু বিভিন্ন জায়গার কিছু মানুষের ঈদ একটু অন্যরকম। যখন সারা দেশ আনন্দে মাতোয়ারা, তখন তাদের চোখে থাকে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে পরিবারকে স্মরণ করার দৃশ্য।বছরের এই বিশেষ দিনে মানুষ সব কষ্ট ভুলে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসে, নতুন পোশাকে সেজে ওঠে ঘর-বাড়ি, রান্নাঘরে ভেসে বেড়ায় সুস্বাদু খাবারের গন্ধ, আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের অনাবিল ছোঁয়া। কিন্তু এই উজ্জ্বল আনন্দের আলোয় ঢাকা পড়ে যায় একদল মানুষের নীরব ত্যাগের গল্প—যারা ঈদের দিনেও ছুটি পায় না, যারা উৎসবের হাসির আড়ালে নিজেদের আবেগকে চেপে রেখে দায়িত্ব পালন করে যায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে।

ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় যখন অধিকাংশ মানুষ ঈদের নামাজের প্রস্তুতি নেয়, তখন কেউ একজন ইউনিফর্ম পরে বেরিয়ে পড়ে ডিউটির উদ্দেশ্যে। তার চোখে থাকে দায়িত্ববোধের দৃঢ়তা, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকে একরাশ না বলা কষ্ট।সন্তানের নতুন জামা পরে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যাওয়ার স্বপ্ন, কিংবা মায়ের হাতে তৈরি সেমাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এসব ছোট ছোট সুখ তাদের কাছে যেন অধরাই থেকে যায়।হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দাঁড়িয়ে থাকা চিকিৎসক বা নার্স, রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত পুলিশ সদস্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করা কর্মী, কিংবা সংবাদ সংগ্রহে ছুটে চলা নির্ভীক সাংবাদিক,ফায়ার সার্ভিস,পরিচ্ছন্ন কর্মী-প্রত্যেকেই নিজের ব্যক্তিগত আনন্দ বিসর্জন দিয়ে অন্যের ঈদকে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলছে।

তাদের জন্য ঈদের দিনটি আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই—বরং আরও বেশি দায়িত্বপূর্ণ, আরও বেশি ব্যস্ততায় ভরা।প্রিয়জনদের “তুমি কবে আসবে?” প্রশ্নের উত্তরে তারা হাসিমুখে বলে—“ডিউটি শেষ হলেই আসছি”—যদিও তারা জানে, সেই অপেক্ষা হয়তো দীর্ঘ হতে চলেছে। ঈদের দিন সকালে যখন সবাই মিলে ঈদের নামাজ পড়তে যায়, তখন কর্মস্থলে থাকা মানুষটি পরিবারের সাথে ভিডিও কলে কথা বলে নিজের কান্না চেপে রেখে হাসিমুখে দায়িত্ব পালন করেন।দায়িত্বের কাছে নিজের আনন্দের পরাজয় বরণ করে।পথের ধারের স্টল বা ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশ বা নিরাপত্তাকর্মী যখন দেখেন, সবাই পরিবার নিয়ে ঘুরছে, তখন নিজের একাকিত্ব তীব্রভাবে অনুভব করেন। তাদের ঈদের পোশাকে থাকে ধুলোবালি, আর পকেটে থাকে প্রিয়জনের জন্য কেনা উপহার।যদিও এই ত্যাগের পেছনে রয়েছে এক ধরনের আত্মসন্তুষ্টি—তাদের দায়িত্বের কারণেই হয়তো হাজারো মানুষ নিরাপদে ঈদ উদযাপন করতে পারছে। তবুও, প্রিয়জনদের ছেড়ে দূরে থাকার এই বেদনা তাদের প্রতিটি ঈদের সকালে একটু হলেও ব্যথিত করে।

তাদের এই ত্যাগ, এই আত্মনিবেদন আমাদের সমাজের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। আমরা যখন নিশ্চিন্তে ঈদের আনন্দ উপভোগ করি, তখন তাদের নিরলস পরিশ্রমই আমাদের সেই নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে। অথচ, তাদের কষ্টের কথা আমরা খুব কমই ভাবি, তাদের একাকীত্ব আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।এই ঈদে, আনন্দের ভিড়ের মাঝেও একবার থেমে আমাদের উচিত সেই মানুষগুলোর কথা স্মরণ করা। একটি আন্তরিক শুভেচ্ছা, একটি কৃতজ্ঞতার বাক্য—“আপনাদের জন্যই আমাদের ঈদ এত সুন্দর”—হয়তো তাদের ক্লান্ত হৃদয়ে এনে দিতে পারে একফোঁটা প্রশান্তি, একটুখানি হাসি।কারণ, ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু নতুন পোশাক বা সুস্বাদু খাবারে নয়; এটি লুকিয়ে আছে ত্যাগের মধ্যে, দায়িত্বের মধ্যে, আর অন্যের সুখের জন্য নিজের আনন্দ বিসর্জন দেওয়ার নিঃস্বার্থ মানসিকতায়। তারা জানেন,তাদের এই কষ্টটা বৃথা নয়। তারা দেশ ও জাতির নিরাপত্তার জন্য, মানুষের সেবার জন্য ঈদের দিনেও ডিউটিতে থাকে। তারা জানে, তাদের এই কষ্টের মূল্য আছে। তারা ভাবে, “আমি যদি ঈদের দিনেও ডিউটিতে না থাকি, তাহলে কে থাকবে? কে মানুষকে নিরাপত্তা দেবে? কে তাদের সেবা করবে?কে ঈদের দিনের সংবাদ তুলে ধরবে?কে দুর্ঘটনায় দ্রুত এগিয়ে আসবে অথবা কে’ই বা আনন্দ উদযাপনের পর ময়লা-নোংরা পরিষ্কার করবে?”

এই পেশাজীবীরাই ঈদের আসল বীর। তাদের ত্যাগ ও আত্মসন্তুষ্টির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের আনন্দের দিনটি।ঈদে যারা ডিউটিতে আছেন, তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অসামান্য। ঈদ হোক সবার জন্য—শুধু যারা উদযাপন করে তাদের জন্য নয়, বরং যারা নীরবে অন্যের আনন্দ নিশ্চিত করতে কাজ করে যায়, তাদের জন্যও। আমরা তাদের জন্য প্রার্থনা করি, যেন তারা সবসময় সুস্থ ও সফল থাকেন।

Share.
Exit mobile version