পবিত্র রমজান মাসের আজই হয়তো শেষ দিন। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামীকাল বা পরশু দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। দীর্ঘ এক মাস রোজা থাকার কারণে আমাদের জীবনযাপন ও খাদ্যাভাসে বিপুল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন থেকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার দিনটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর। ঈদে আমরা অনেকে অনিয়ম এবং বেহিসাবি খেয়ে ফেলি। এক মাস পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার পাকস্থলী সহ্য করতে পারে না। অর্থাৎ পাকস্থলীর এনজাইমগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা, পাতলা পায়খানা, বমি, পেট ফেঁপে যাওয়া, পেটে গ্যাস অর্থাৎ পেটের যাবতীয় সমস্যা দেখা যায়। কিভাবে সুস্থতা এবং আনন্দের সাথে নির্বিঘ্নে ঈদুল ফিতর অতিবাহিত করতে পারি সে বিষয়ে আমাদের আজকের আয়োজনে পাঠকদের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল হাসান পান্নু। তার সাথে কথা বলে বিষয়টি তুলে ধরেছেন কাজী নূর।

সাধারণত ঈদের দিন প্রচুর তৈলাক্ত খাবার যেমন, বিরিয়ানি, কোর্মা-পোলাও, গরু, মুরগি বা খাসির মাংস সেই সঙ্গে সেমাইসহ হরেক রকম মিষ্টিজাতীয় খাবার আমরা খাই। তৈলাক্ত ও ঝাল মসলাযুক্ত খাবার এবং একসঙ্গে বেশি খাওয়ার ফলে পেটে অস্বস্তিকর অনুভূতি, পেট ভরা ভরা ভাব, বারবার টক ঢেকুর ওঠা ছাড়াও বুকে ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে। এ সময় পাকস্থলী ও ডিওডেনামের ক্ষতে পুনরায় প্রদাহের সৃষ্টি হয়। আইবিএস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম রোগে যারা ভোগেন, তাদের সমস্যাটা আরো বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারগুলো যেমন পায়েস, সেমাই, হালুয়া ইত্যাদি খাবারে অস্বস্তি, ঘন ঘন মলত্যাগ ও অসম্পূর্ণ মলত্যাগের অনুভূতি হয়। আবার বিভিন্ন খাবার অন্ত্র থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে।

ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যাদের এনাল ফিশার ও পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, ব্যথা ইত্যাদি আগে থেকেই আছে, তাদের এ সমস্যা আরো বেশি প্রকট হয়। যাদের হিমোরয়েড বা পাইলসের সমস্যা আছে, তাদের পায়ুপথে রক্তক্ষরণও হতে পারে। অনেক সময় পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যাওয়ার দরুণ হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত হওয়া লাগতে পারে। তাই ঈদে নিয়ন্ত্রিত ভোজন করা উত্তম। মনে রাখতে হবে ঈদের সময় শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকলে সব আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। তাই ভুরিভোজ নয়, সহজপাচ্য এবং পরিমিত খাবার ঈদে এনে দিতে পারে প্রশান্তি।

সকালে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অল্প করে সেমাই বা পায়েস খাওয়া ভালো; তবে তা অল্প চিনি দিয়ে রান্না করলে ভালো হয়। এগুলোর সঙ্গে বাদাম, কিসমিস, বিভিন্ন ফলের জুস যেমন পেঁপে, তরমুজ, বাঙ্গি ইত্যাদি খেতে পারেন। যেকোন পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এবং সহজেই হজম হয়। ফলে আছে লেভ্যুলোজ ও ফ্রুক্টোজ নামক সহজ শর্করা। ফলের চিনি শরীরকে তরতাজা ও এর আঁশে যে সেল্যুলোজ থাকে তা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

এসব খাওয়ার আধাঘণ্টা পর দেড় থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাবেন। ঈদের দিন অনেকে চটপটিজাতীয় খাবার খেয়ে থাকেন। এটি এড়িয়ে চলা ভালো। দুপুরে পোলাও বা বিরিয়ানির সঙ্গে অবশ্যই টমেটো, শষা বা সালাদ জাতীয় খাবার সেই সঙ্গে দই খেতে পারেন।

ঈদের খাবারে তেল, ঝাল-মসলা, ঘি যত কম হবে তত ভালো। দুপুর ও রাতের খাবারে অল্প মসলার তৈরি কোরমা খেতে পারেন। এটা যেমন উপাদেয় ও সহজপাচ্য। পোলাও, বিরিয়ানি খেতে অসুবিধা হলে পোলাওয়ের চালের ভাত অথবা সেই ভাতকে সামান্য তেল দিয়ে ফ্রায়েড রাইস করেও খাওয়া যেতে পারে। মুরগি, গরু বা খাসির মাংস খাওয়া যাবে যদি অতিরিক্ত তেল বা চর্বি না থাকে। সঙ্গে চাটনি, আচার, সালাদ, লেবু থাকলে ভালো হয়। খাবারের পর টক বা মিষ্টি দই পরিবেশন করা স্বাস্থ্যসম্মত। দই প্রো-বায়োটিক হিসেবে কাজ করে। এর ল্যাক্টোক্যাসিলাস ভালো ব্যাকটেরিয়াকে উদ্দীপ্ত করে পরিপাক ক্রিয়াকে সহজতর করে। যাদের রক্তে কোলেস্টারল বেশি বা উচ্চরক্তচাপ আছে অথবা হার্টের সমস্যা আছে তারা অবশ্যই তেল চর্বি জাতীয় খাবার এড়িয়ে যাবেন। পাশাপাশি কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে যা তাৎক্ষণিকভাবে কাজে দিতে পারে।
চিকিৎসক পরামর্শ

১। পেট ভরে খাওয়া যাবে না। যতটুকু খাবেন ভালো করে চিবিয়ে খেতে হবে। রাতে খাওয়ার পর অন্তত দুই ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বিছানায় যাবেন।

২। খাওয়ার সময় গল্প করা যাবে না। এতে করে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত বাতাস প্রবেশ করে, ফলে ঢেকুর তোলার সমস্যা হয়।
৩। কোমল পানীয়, চিনিযুক্ত পানীয় পরিহার করে চিনি ছাড়া ফলের জুস, বোরহানি, টক দই, পুদিনা লাচ্ছি, ডাবের পানি ইত্যাদি খেতে পারেন।

৪। গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা আইবিএস বা অন্যান্য পেটের রোগে যারা ভুগছেন তারা ডমপেরিডন, ওমিপ্রাজল বা প্যান্ট্রোপ্রাজল, এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ খাবেন। আইবিএস থাকলে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করবেন। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা, এনাল ফিশার ও পায়ুপথে জ্বালাপোড়া বা ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা আছে, তারা ইসবগুলের ভূসি, বেল, পেঁপে ইত্যাদি খেতে পারেন।

৫। খাবার ঘনঘন পানি খাওয়া উচিত না। এতে হজম রসগুলো পাতলা হয় এবং হজমে অসুবিধা হতে পারে। তাই খাওয়ার অন্তত আধা বা এক ঘণ্টা পর পানি পান করা উত্তম।

৬। উদ্ভুত যেকোন সমস্যায় পড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

Share.
Exit mobile version