বাংলার ভোর প্রতিবেদক  
যশোরের কেশবপুরে প্রত্যন্ত একটি গ্রাম সাগরদাঁড়ি। এই গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদের পাড়ে ধূসর আর সাদা রঙের প্রাচীন জমিদার বাড়ি। বাড়ির ভিতরে সু-বিশাল আম্রকাননে ছায়া সুনীবিড়। দুই শ’ ৩ বছর আগে ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এই বাড়িতে জন্মেছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি নেই তবে বাড়ির পুরোটাজুড়েই যেন শুধু তার স্মৃতি। জন্মের এতো বছর পরও অনবদ্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যদিয়ে অমর তিনি।
কবির বাড়ির পুরোটাই এখন জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নাম দিয়েছে মধুপল্লী। এই মধুপল্লীই পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় স্থান। বছরে দেড় লক্ষাধিক পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকলেও নানা সংকটে পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি মধুপল্লী। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিকল্পিত উদ্যোগের মধুপল্লী হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন স্পষ্ট এমনটা মনে করছেন সংশ্লিষ্ঠরা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মধুপল্লির ভেতরে রয়েছে কবির বাড়ির একটি অংশ ঠাকুরঘর, মনোমুগ্ধকর দিঘি। প্রবেশদ্বার পার হলেই কবিদের ঠাকুরঘর। এই ঘরের পাশ দিয়েই কবিগৃহে ঢুকলেই কবি পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র। ঘরগুলো এখনো পুরোনো স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সব সময় স্নিগ্ধ পরিবেশ তৈরি করে রাখে। শেষ প্রান্তে একটি তুলসীগাছ কবির জন্মস্থানকে জানান দেয়। এখানে কবির রচনাবলি সংরক্ষিত আছে। কবির বাড়ির সামনে কপোতাক্ষ নদ। যদিও কবির বর্ণনার সেই জৌলুশ এখন আর নেই কপোতাক্ষ। তবে কবির বাড়ির পেছনের অংশে স্মৃতিময় সেই বটগাছ আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব। এই বটবৃক্ষ নিয়ে কবি কবিতা লিখেছিলেন। কপোতাক্ষ নদের পাশেই জেলা পরিষদের ডাকবাংলো। এই ডাকবাংলোর পেছনেই আছে বিদায় ঘাট। কথিত আছে কবি ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে একবার সাগরদাঁড়িতে আসেন। কিন্তু কঠিন সামাজিক প্রথা এবং জমিদারবাড়ির অনুশাসনের কারণে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে না পেরে তিনি বজরায় করে আবার ফিরে যান। কবির শৈশব স্মৃতির অনন্য নিদর্শন হয়ে পাশের শেখপুরা গ্রামের মসজিদটি। এই মসজিদে কবি পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি ফারসি শিখতেন। কবি সম্পর্কে জানতে কবির বাড়িতে প্রতিদিন পর্যটকেরা ভিড় জমায়।

কয়েকজন দর্শীনার্থী জানান, স্মৃতিবিজড়িত মধুপল্লীতে নানা সংকট রয়েছে। রেস্ট হাউজ, ক্যাফেটোরিয়া, শিশু কর্ণার নেই। ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ, পুকুরপাড় বাঁধাই, পুরাতন আম গাছতলা বাধাই ও ভবনের নকশা ঠিক রেখে সংস্কার করা জরুরি। অবকাঠামো উন্নয়ন ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে মধুপল্লীতে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে। পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে উঠবে কবিতীর্থ সাগরদাঁড়ি।

মধুপল্লীর কাস্টডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা সাগরদাঁড়িতে বছরে দেড় লক্ষাধিক পর্যটকের আগমন ঘটে। তাঁর স্মৃতি ও স্থাপনা ঘিরে পর্যটকদের আকর্ষণ থাকে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সৌন্দর্য্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মধুপল্লীকে আরও পর্যটকবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।’
জানাগেছে, ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাগরদাঁড়ির জমিদারগৃহে মাতা জাহ্নবী দেবীর কোলজুড়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট আইনজীবী রাজনারায়ণ দত্ত। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন মৃত্যুবরণ করেন। মহাকবিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি অভিযোগ স্থানীয় সাংস্কৃতিককর্মী ও ইতিহাস গবেষকদের। ইতিহাস গবেষক সাজেদ রহমান বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে মধুসূদনকে চর্চা ও তার সাহিত্য গবেষণার জন্য যশোরে একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।

♦ এবার হচ্ছে না মধুমেলা
মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম উৎসব ঘিরে ১৯৮০ দশকে বিসিকের উদ্যোগে সাগরদাঁড়িতে গ্রামীণ মেলার প্রচলন হয়। মধু মেলাকে ঘিরে সাগরদাঁড়িকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। দেশ বিদেশের কয়েক লাখ মধুভক্তের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মধুপল্লী। চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা সেই ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা এবার বসছে না। মেলা না হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হতাশ। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেকসোনা খাতুন বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কারণে এবার মেলা হচ্ছে না। তবে কবির ২০২ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে কেক কাটা, কবির স্মৃতির ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা জানানোসহ আলোচনা সভা হবে।’

Share.
Exit mobile version