মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টু, কেশবপুর
যশোরের কেশবপুর উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে মাছের ঘের ভরাটের অভিযোগ উঠেছে একাধিক ঘের মালিকের বিরুদ্ধে। শুধু ভূগর্ভস্থ পানিই নয়, বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল থেকে সেচের মাধ্যমে পানি তুলে ঘের ভরাট করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘের মালিকরা আগেভাগেই মাছ চাষের প্রস্তুতি হিসেবে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছেন। এতে পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির চাপ সৃষ্টি হয়ে জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, কেশবপুর উপজেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৫৮টি মাছের ঘের রয়েছে। এছাড়া পুকুর রয়েছে ৬ হাজার ৬৪৬টি। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বছর অতিবৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি উপচে পড়ায় কেশবপুরের অন্তত ১০৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়। ঘেরের পানি উপচে মানুষের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে। এতে মাছের ঘের ও কৃষি ফসল মিলিয়ে শত শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। বহু পরিবার দীর্ঘদিন পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করে।
সম্প্রতি সরেজমিনে পৌরসভাসহ উপজেলার পাঁজিয়া, সুফলাকাটি, গৌরিঘোনা, মঙ্গলকোট, বিদ্যানন্দকাটি ও সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘের মালিক বর্ষা শুরুর আগেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাধ্যমে ঘের ভরাট করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এভাবে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় ব্যাপকহারে পানি উত্তোলন অব্যাহত থাকলে সামনের বর্ষায় আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
২৭ বিল পানি নিষ্কাশন কমিটির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান মাস্টার মকবুল হোসেন মুকুল বলেন, “গত বছর অতিরিক্ত বৃষ্টি ও নদ-নদীর উপচে পড়া পানিতে উপজেলার বহু এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এবারও যদি নির্বিচারে পানি উত্তোলন করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এজন্য ঘের মালিকদের আগেই মাছের ঘের স্থাপন নীতিমালা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।”
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সূদীপ বিশ্বাস বলেন, “কেশবপুরে বিপুল সংখ্যক মাছের ঘের রয়েছে। ঘের মালিকদের ভবদহ এলাকার ঘের স্থাপন নীতিমালা অনুসরণ করে মাছ চাষ করতে বলা হয়েছে। অনেক ঘের মালিক এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত পানি উত্তোলনের আবেদন করেছেন। বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।”
এদিকে উপজেলা প্রশাসনও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন বলেন, “গত বৃহস্পতিবার মাছের ঘের মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ যদি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে ঘেরে পানি নেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পানি উত্তোলন বন্ধ এবং ঘের স্থাপনে কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষা মৌসুমে নতুন করে দুর্ভোগে পড়তে পারেন হাজার হাজার মানুষ।
