শরিফুল ইসলাম
বাংলার প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন আতিয়া মসজিদ আজও চার শতকের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে। মুঘল আমলে নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও আধ্যাত্মিক চর্চার এক অনন্য দলিল।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৬১০-১৬১১ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর শাসনামলে স্থানীয় জমিদার সায়েদ খান পন্নী মসজিদটি নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, একজন প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ আদম কাশ্মীরীর স্মরণে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাঁর মাজার মসজিদের পাশেই অবস্থিত, যা ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে আতিয়া মসজিদ অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। এটি আয়তাকার গঠনের একগম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ, যার কেন্দ্রে একটি বৃহৎ গম্বুজ এবং চার কোণায় চারটি অষ্টভুজাকৃতির মিনার রয়েছে। দেয়ালের টেরাকোটা অলংকরণ, লতা-পাতা ও জ্যামিতিক নকশা মুঘল ও বাংলা স্থাপত্যরীতির মিশ্রণকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। লালচে পোড়ামাটির নকশা ও কারুকাজ মসজিদটির নান্দনিক সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।

মসজিদটি টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে অবস্থিত। প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এই স্থানটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার মসজিদটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে। এর গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ১০ টাকার নোটে আতিয়া মসজিদের ছবি সংযোজন করা হয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে এর পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক ক্ষয় ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মসজিদের কিছু অংশে ফাটল ও ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আরও দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির সংরক্ষণে কাজ করছে বলে জানা গেলেও নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

আতিয়া মসজিদ শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক। চার শতকেরও বেশি সময় ধরে এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইতিহাসের গল্প শোনাচ্ছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও সচেতনতার মাধ্যমে এই অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একইভাবে গৌরবের প্রতীক হয়ে থাকবে—এমন প্রত্যাশাই সবার।

Share.
Exit mobile version