মাগুরা সংবাদদাতা
মাগুরা সদর উপজেলার মঘী ইউনিয়নের বড় খড়ী গ্রাম একসময় যেখানে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ছিল সীমিত, আজ সেই গ্রামই হয়ে উঠেছে গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা মহাইমিন আলম, যিনি মাশরুম চাষকে ঘিরে গড়ে তুলেছেন কর্মসংস্থানভিত্তিক এক সফল উদ্যোগ।

অল্প পুঁজি ও সীমিত সুযোগ নিয়ে নিজের বাড়ির একটি ছোট ঘর থেকে যাত্রা শুরু করেন মহাইমিন আলম। শুরুতে অভিজ্ঞতার অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বাজারজাতকরণের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলেও ধীরে ধীরে তিনি গড়ে তোলেন আধুনিক ও কার্যকর একটি মাশরুম উৎপাদন ও সংগ্রহ কেন্দ্র। বর্তমানে তার এই উদ্যোগ শুধু একটি খামার নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

তার প্রতিষ্ঠিত সেন্টারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি মাইক্রো-উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক, যেখানে বড় খড়ী গ্রামসহ আশপাশের এলাকার শতাধিক নারী সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। তারা ঘরে বসেই মাশরুম উৎপাদন করছেন এবং উৎপাদিত পণ্য মহাইমিন আলমের কাছে সরবরাহ করে নিশ্চিত বাজার পাচ্ছেন। ফলে তাদের আয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা।

এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত নারীদের মধ্যে রয়েছেন নাসিমা খাতুন, ফাতেমা আক্তার, সুচিত্র বসু, কৃষ্ণা বিশ্বাস, রেনুকা বিশ্বাস, রাখি আক্তার, রূপবান বিবি, ইতিকা রানী, আকলিমা খাতুন ও বিউটি খাতুন। তারা প্রত্যেকেই আজ স্বাবলম্বিতার জীবন্ত উদাহরণ।

নাসিমা খাতুন বলেন, “একসময় সংসারে অনেক কষ্ট ছিল, নিজের কোনো আয় ছিল না। এখন নিয়মিত আয় করছি, সংসারে অবদান রাখতে পারছি।”

ফাতেমা আক্তার জানান, “মহাইমিন ভাই আমাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এখন আমরা নিজেরাই উৎপাদন ও বিক্রয় করতে পারছি।”

সুচিত্র বসু বলেন, “এই উদ্যোগ আমাদের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এখন আমরা কারও ওপর নির্ভরশীল নই।”
কৃষ্ণা বিশ্বাস ও রেনুকা বিশ্বাস বলেন, “নিজেদের আয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে পারছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।”

রাখি আক্তার ও রূপবান বিবি জানান, “আমরা চাই এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হোক, যাতে আরও নারী উপকৃত হতে পারে।”
অন্যদিকে ইতিকা রানী, আকলিমা খাতুন ও বিউটি খাতুন বলেন, “এখন আমরা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করছি, সমাজে আমাদের মূল্য বেড়েছে।”

প্রতিদিনই এসব নারী তাদের উৎপাদিত মাশরুম নিয়ে সেন্টারে আসেন। এখানে শুধু পণ্য বিক্রিই নয়, বরং গড়ে উঠেছে একটি সহযোগিতা ও শেখার প্ল্যাটফর্ম-যেখানে তারা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা আরও উন্নত করছেন।
তরুণ উদ্যোক্তা মহাইমিন আলম বলেন, “আমার লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়—আমি একটি টেকসই কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। বিশেষ করে নারীরা যদি ঘরে বসেই আয় করতে পারে, তাহলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব।”

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে মাশরুম বিদেশে রপ্তানির পাশাপাশি একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রসেসিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, উন্নত প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে কাজ করা হবে।

স্থানীয়দের মতে, মহাইমিন আলমের এই উদ্যোগ শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক সফলতা নয়—এটি একটি সামাজিক আন্দোলন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং নারীদের ক্ষমতায়নের বাস্তব উদাহরণ তৈরি করছে।

Share.
Exit mobile version