বাংলার ভোর প্রতিবেদক

সকাল থেকেই সূর্যের তীব্র তাপ। দুপুর গড়াতেই যেন আগুন ঝরতে শুরু করে আকাশ থেকে। পিচঢালা সড়কগুলো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, বাতাসও যেন গরম চুল্লির হাওয়া। কয়েকদিন ধরে চলমান তাপপ্রবাহে যশোরের জনজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিসহ। প্রখর রোদ, অস্বস্তিকর গরম আর রাতের ভ্যাপসা আবহাওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন জেলার বাসিন্দারা।

বুধবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুরে; ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোর ও কয়রা উপজেলায়। এখানে ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিন দুপুরের দিকে যশোর শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোতেও মানুষের উপস্থিতি কমে যায়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে চাইছেন না। তবে জীবিকার তাগিদে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষদের কাজ থামিয়ে রাখার সুযোগ নেই। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করেই তাদের ছুটতে হচ্ছে জীবন-সংগ্রামের পথে।

যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকার রিকশাচালক গোলাম রসুল বলেন, ‘রাস্তায় বের হলেই মনে হয় আগুনের মধ্যে আছি। একটু পরপর পানি খেতে হচ্ছে।’

একই অবস্থা নির্মাণ শ্রমিকদের। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে যাচ্ছেন। গরমের কারণে কাজের গতি কমে যাওয়ায় শ্রমঘণ্টাও কমে এসেছে অনেকের। তেমনি একজন জাফর আলী বলেন, এ গরমে আর কাজ করতে পারছি না। মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা পানির ভিতর বসে থাকি।

শহরের বাজারগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। দুপুরের পর ক্রেতার সংখ্যা কম। তাইতো তালেব সেখ দোকানে অলস সময় পার করছেন। তিনি বলেন, গরমে মানুষ ঘরে থাকায় ব্যবসায়ও প্রভাব পড়েছে। গরমে মানুষ বের হতে পারছে না।’

শুধু দিনের গরমই নয়, রাতেও মিলছে না স্বস্তি। সূর্য ডোবার পরও বাতাসে গরমের তীব্রতা কমছে না। ফলে অনেকের রাতের ঘুম ব্যাহত হচ্ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকে ঘরে ফ্যান চালিয়েও স্বস্তি পাচ্ছেন না।

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এ সময়টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তারা বেশি বেশি পানি ও তরল খাবার গ্রহণ এবং অপ্রয়োজনে রোদে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম জানান, চলমান তাপপ্রবাহ আগামী দু-এক দিন অব্যাহত থাকবে, তবে এ তাপপ্রবাহ আরও কয়েকটি জেলায় বিস্তৃত হতে পারে। এর মধ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। বৃষ্টিপাত হলে তাপপ্রবাহ কমে আসবে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণ হতে পারে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা জেলাসহ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।

বৃহস্পতিবার ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণ হতে পারে। এদিন সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

এদিকে, জুন-আগস্টের মধ্যে এল নিনো তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমও জানিয়েছে, উষ্ণমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এটি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়মে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।

জুন থকে আগস্ট মাসের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে সংস্থাটি জানায়, বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বজায় থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে কিছু অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক জলবায়ু কেন্দ্রগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে কম মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে।

এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া। এর ফলে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় রেখায় অবস্থিত প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো ফিরে আসে। এটি প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

প্রকৃতিতে সাধারণত এল নিনো এবং এর বিপরীত শীতল পরিস্থিতি ‘লা নিনা’ চক্রাকারে আবর্তিত হয়। এই দুই পরিস্থিতির মধ্যবর্তী সময়টাতে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ত্রৈমাসিক তথ্য অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যে এল নিনো পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়ার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি। বেশিরভাগ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো মাঝারি বা বেশ শক্তিশালী রূপ নিতে পারে।

Share.
Exit mobile version