শরিফুল ইসলাম
সাতক্ষীরা জেলার তালা থানায় অবস্থিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহাসিক মসজিদ হলো তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ। ১৮৫৮-৫৯ সালে জমিদার খান বাহাদুর কাজী সালামাতুল্লাহ খান এটি নির্মাণ করেন। তালা সদর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে তেঁতুলিয়া গ্রামে অবস্থিত ৬ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যের আদলে নির্মিত এবং স্থানীয়ভাবে ‘মিয়ার মসজিদ’ নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক সূত্র মতে, ব্রিটিশ শাসনামলের প্রারম্ভিক সময়ে ধর্মীয় চর্চা ও সামাজিক সংহতি জোরদার করার লক্ষ্যে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। জমিদার কাজী সালামাতুল্লাহ খান ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সমাজসেবায় নিবেদিত ব্যক্তি। তাঁর উদ্যোগেই এলাকার মুসলমানদের জন্য একটি বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন জামে মসজিদ নির্মিত হয়, যা আজও অঞ্চলের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। ছয়টি গম্বুজ সমানুপাতিক বিন্যাসে স্থাপিত, যা মুঘল আমলের নির্মাণরীতির প্রভাব বহন করে। মোটা প্রাচীর, খিলানযুক্ত দরজা-জানালা এবং নান্দনিক মিহরাব মসজিদটির প্রাচীনত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে। গম্বুজগুলোর গঠনশৈলীতে ঐতিহ্যবাহী অলংকরণ দেখা যায়, যা সে সময়কার কারিগরি দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে।

মসজিদের সামনের প্রশস্ত প্রাঙ্গণ ও পুকুর এলাকাবাসীর কাছে শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। ঈদ, জুমা ও রমজান মাসে এখানে মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। বিশেষ করে ঈদের জামাতে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকেও মানুষ অংশ নিতে আসেন।

স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মিয়ার মসজিদ’ নামে সুপরিচিত—সম্ভবত প্রতিষ্ঠাতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকেই এই নামকরণ। সময়ের পরিক্রমায় মসজিদটিতে একাধিকবার সংস্কার কাজ হয়েছে, তবে মূল কাঠামোর ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

ঐতিহ্য সংরক্ষণবিদদের মতে, তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি সাতক্ষীরা অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

ছয় গম্বুজের এই শাহী মসজিদ আজও তালা উপজেলার গর্ব—ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তেঁতুলিয়া গ্রামের বুকে।

Share.
Exit mobile version