নড়াইল সংবাদদাতা

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবটি তালাবদ্ধ, আর বিষয়টির পাঠদানে নেই কোনো শিক্ষক। তথ্য প্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিদ্যালয়টির শত শত শিক্ষার্থী। অথচ কম্পিউটার শিক্ষক পদে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিদ্যালয়ে না থেকেও বেতনসহ সরকারি সকল সুবিধা পাচ্ছেন এক শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও বেতন ভাতা তুলেছেন প্রায় অর্ধকোটি টাকা। অথচ বিদ্যালয়ে পাঠদান তো দূরের কথা একটি দিনের জন্যও বেড়াতেও আসেননি সেই শিক্ষক পীযুশ কান্তি ঘোষ।

এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান বিদ্যালয়টির অন্যান্য শিক্ষক ও এলাকাবাসী। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরের বছর এমপিওভুক্ত হয়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৪০১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছেন।

বিদ্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০০৬ সালে দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষকের শূন্য পদে পীযুষ কান্তি ঘোষ যোগদান করেন। ৩ বছর চাকরি করেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় ২০০৯ সালে তিনি ঢাকায় গিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হন। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও অদৃশ্য কোনো এক ক্ষমতাবলে এমপিওভুক্ত হন শিক্ষক পীযুশ। সেই থেকে একটি বারের জন্যও বিদ্যালয়ে আসেননি তিনি। অথচ দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ (এমপিও) প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বেতন সুবিধা ভোগ করেছেন শিক্ষক পীযুশ কান্তি ঘোষ।

শিক্ষক পীযুশ কান্তি ঘোষের ব্যাংক হিসাবের (স্টেটমেন্ট) সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায় বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক নীরঞ্জণ কুমার বসু (১৯৮৪-২০১২), পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক অনন্ত কুমার বিশ্বাস (২০১২-২০১৪), তুষার কান্তি ঘোষ (২০১৪-২০২২), গোলক চন্দ্র বিশ্বাস (২০২২-২০২৫), আবারও তুষার কান্তি ঘোষ (২০২৫-ডিসেম্বর থেকে অদ্যবধি) দায়িত্ব পালন করেন। পীযুশ কান্তির বেতন উত্তোলন কান্ডে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়।

তবে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষকের বেতন উত্তোলনসহ বিদ্যালয়টির আর্থিক অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগ বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষের বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জুনে ও শিক্ষক পীযুশ কান্তির ব্যাংক হিসাবে টাকা লেনদেন প্রমান পাওয়া গেছে। বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত আছেন পীযুশ কান্তি ঘোষ।

বিদ্যালয়টির অবসরপ্রাপ্ত দুই প্রধান নীরঞ্জণ কুমার বসু এবং অনন্ত কুমার বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আড়াই বছর দায়িত্বে থাকা বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক যিনি বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত এবং বর্তমান প্রধান শিক্ষকের একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেন।

সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলক চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আড়াই বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেছি। তখন কম্পিউটার শিক্ষক পীযুশের বেতন বন্ধ রাখি। প্রধান শিক্ষক পুনঃবহাল হয়ে আবারও তার বেতন চালু করেন। ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুযায়ী আপনার দায়িত্ব কালীন সময়ে পীযুশের বেতন একাউন্টে ঢুকেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- ‘আমি কোনো আবেদন করিনি, তবে কিভাবে ঢুকছে আমার জানা নাই।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ অনুপস্থিত শিক্ষকের বেতন ব্যাংক একাউন্টে জমা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে পীযুশকে নোটিশ করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। হাইকোর্টের এক রায় অনুযায়ী বরখাস্ত করলেও তার প্রাপ্য টাকা একাউন্টে ঢুকেছে। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে চক্রান্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিলো। সেই আড়াই বছরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলক পীযুশের বেতন চালু রেখেছিলো। আমি যোগদান করে তার দেখানো পথে পীযুশের বেতন ৩ মাস চালু রাখি, পরে আবার বন্ধ করে দেই। শিক্ষকদের বেতন চালু বিষয়ে কমিটির সিদ্ধান্তের বাহিরে প্রধান শিক্ষকের সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকেনা। তৎকালীন কমিটির সিদ্ধান্তে বেতন চালু রাখতে বাধ্য হই।

এসকল অভিযোগের বিষয়ে পীযুশ কান্তি ঘোষ মুঠোফোনে বলেন, ২০০৯ সালে স্কুলের চাকরি ছেড়ে এসেছি। বিদ্যালয়ে আর কখনো যাইনি। তবে এসব বেতন উত্তোলন ও এমপিওর বিষয়টি সম্প্রতি বিভিন্ন মারফতে জানতে পেরেছি। তবে এসব টাকার বিষয়ে আমার কিছু জানা নাই। তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘দীর্ঘ এতো বছরে ব্যাংকে আমি কখনো যাইনি। কিভাবে আমার একাউন্টে লেনদেন হচ্ছে, কখনো ব্যাংক থেকেও আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে এ ব্যাপারে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নড়াইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জালাল উদ্দিন বলেন, দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত থেকেও শিক্ষক পীযুশ সরকারি বেতন ভাতা গ্রহণ করছেন, যেটি গর্হিত অপরাধ। আর একজন শিক্ষকের একার পক্ষে এ কার্যক্রম চালানো সম্ভব না। আমি সম্প্রতি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেছি। তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে উর্ধতন সকল দপ্তরে বিষটি জানাবো। আশা করি এই চক্রের সকলের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

Share.
Exit mobile version