বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোর শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত কোনভাবেই পথচারীদের জন্য নিরাপদ হচ্ছে না। দিনের পাশাপাশি রাতেও শহরের ফুটপাতগুলো অনিরাপদ হয়ে উঠছে দিন দিন। শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা, আলী হোসেন মনি সড়কসহ (প্যারিস রোড), ঈদগাহ মোড়, সদর হাসপাতাল সড়ক, চিত্রা মোড়, পালবাড়ি ও মণিহার মোড় এলাকাগুলোর ফুটপাত এখন ফাস্টফুড ব্যবসায়ী, ভ্রাম্যমাণ দোকান এবং ইজিবাইক চালকদের দখলে। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটপাত বাদ দিয়ে সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করছেন। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে যানজট, ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন বিকেলের পর থেকে দড়াটানা এলাকায় ফুটপাতের অধিকাংশ স্থান দখল করে বসানো হয় ফাস্টফুডের অস্থায়ী দোকান। শুধু দোকানই নয়, ক্রেতাদের বসার জন্য রাস্তার ওপর পর্যন্ত টুল ও চেয়ার পেতে রাখা হয়। এতে সড়কের উল্লেখযোগ্য অংশ সংকুচিত হয়ে পড়ে। একই সময়ে রাস্তার বাকি অংশে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে ওঠে।
ফলে দড়াটানা থেকে যশোর জেনারেল হাসপাতাল পর্যন্ত ব্যস্ত সড়কটি বিকেলের দিকে কার্যত দুই লেন থেকে এক লেনে নেমে আসে। যানবাহনের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন হাসপাতালগামী রোগী, নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
প্যারিস রোড থেকে ঈদগাহ মোড় পর্যন্ত একই চিত্র দেখা যায়। ফুটপাতজুড়ে ফাস্টফুড, চটপটি, ফুচকা ও বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বসানো হয়েছে। ফলে পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় দুই লেনের রাস্তা এক লেনে নেমে আসে। ফলে ওই এক লেন দিয়েই দুই পাশের পথচারি ও গাড়ি চলাচল করে। অনেককেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সড়কে হাঁটতে দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ফুটপাত ও সড়কের অংশবিশেষ দখল হয়ে যাওয়ায় যানবাহন ও পথচারীদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ে। প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
প্যারিস রোডে ব্যবসায়ী সোবহান বলেন, ‘পৌরসভার লোকজনকে প্রতিমাসে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করি। এতে আমরা একধরনের বৈধতা পেয়েছি। অভিযান চলার আগেই আমাদের জানানো হয় অভিযানের খবর। তখন আমরা দোকানপাট বন্ধ রাখি।’
আরেক ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন আমরা রাস্তার পাশের জায়গায় ব্যবসা করছি। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ হয়। আবার ঘর গড়ি। আমাদের আসলে ভাঙা-গড়ার মধ্যেই থাকতে হয়।’
সচেতন নাগরিক ইমরান হাসান বলেন, ফুটপাত মূলত পথচারীদের জন্য নির্মিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের কারণে তা তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে দখলদাররা। ফলে স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
পথচারি আলমগীর হোসেন বলেন, যশোরের মতো দ্রুত বর্ধনশীল শহরে ফুটপাত দখল শুধু সৌন্দর্যহানির বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং শহরের শৃঙ্খলার জন্যও বড় হুমকি। ফুটপাত ব্যবহার নিশ্চিত না হলে মানুষ সড়কে নামতে বাধ্য হবে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে সম্প্রতি যশোর শহরের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসনে জন্য এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন অরাজনৈতিক সংগঠন ‘জনউদ্যোগ’। সেখানে জনউদ্যোগে যশোরের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমদ বলেন, যশোর শহরে দিন দিন যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
এতে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, অফিসগামী মানুষ ও রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশেষ করে রিকশা, মোটরসাইকেল ও থ্রিহুইলারের বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলের কারণে শহরে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বাড়ছে।’
যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, আমরা খোঁজ খবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
শহরবাসীর দাবি
অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি বিকল্প হকার জোন, নির্দিষ্ট ইজিবাইক স্ট্যান্ড এবং কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু না করলে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নগরবাসীর চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে পৌরসভা, জেলা প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাদের প্রশ্ন
পথচারীদের জন্য নির্মিত ফুটপাত যদি ব্যবসা ও যানবাহনের দখলে চলে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে হাঁটবে কোথায়? যশোর শহরের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
