শরিফুল ইসলাম
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক জনপদ বাগেরহাটে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদ আজও মধ্যযুগীয় ইসলামি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। পঞ্চদশ শতকে নির্মিত এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং প্রাচীন বাংলার সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইসলামের বিস্তারের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বাংলার প্রখ্যাত সুফি সাধক ও শাসক খান জাহান আলী খলিফাতাবাদ নগরী প্রতিষ্ঠার সময় এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত এই স্থাপনাটি সে সময় ধর্মীয় কার্যক্রম, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তাঁর নেতৃত্বে বাগেরহাট অঞ্চল ইসলামি সংস্কৃতি ও নগর পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

স্থাপত্য দৃষ্টিকোণ থেকে ষাট গম্বুজ মসজিদ অত্যন্ত অনন্য। নামের সঙ্গে “ষাট” শব্দটি যুক্ত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে মসজিদটির ছাদে রয়েছে ৭৭টি গম্বুজ, যা ৬০টি পাথরের স্তম্ভের ওপর নির্মিত। মসজিদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১০৮ ফুট। লাল ইটের তৈরি পুরু দেয়াল, খিলানযুক্ত দরজা এবং চার কোণের বুরুজ প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর দৃঢ়তা ও সৌন্দর্যকে তুলে ধরে। পূর্বদিকে ১১টি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার আলো-বাতাস চলাচলের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি উপমহাদেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম একগম্বুজ-ভিত্তিক বহুগম্বুজ মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা তৎকালীন মুসলিম স্থাপত্যকৌশল ও প্রকৌশল দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন। মসজিদের ভেতরের সারিবদ্ধ স্তম্ভ ও খিলানগুলো দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরীকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে মসজিদটি সংরক্ষিত রয়েছে এবং নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য মুসল্লি ও দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে ভিড় করেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব, নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী এবং ধর্মীয় মর্যাদার সমন্বয়ে ষাট গম্বুজ মসজিদ আজও বাংলার গৌরবময় অতীতের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

Share.
Exit mobile version