হিমেল খান :
দখল আর অবৈধ মাছের ঘেরে অস্তিত্ব হারিয়েছে যশোরের ভায়না নদী। কোথাও নদীর বুকজুড়ে বাঁধ, কোথাও আবার মাঝপথে মাটি ফেলে বন্ধ করা হয়েছে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ। ফলে নদীর বড় অংশ এখন কার্যত অস্তিত্বহীন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাজারো বিঘা কৃষিজমি। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, ২০২১ সালে নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে যে সরকারি মামলা করা হয়েছিল, সেই মামলার আসামিরাই এখনো নদীর বড় অংশ দখল করে রেখেছে এবং উল্টো নতুন করে বাঁধ ও ঘের তৈরি করে সুবিধা নিচ্ছে। যদিও নদী দখলমুক্ত ও সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
শার্শার ইছামতি নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে ঝিকরগাছার রাধানগর পেরিয়ে কপোতাক্ষে মিলিত হওয়া এক সময়ের খরস্রোতা ভায়না নদী দীর্ঘদিন ধরে দখল ও অবৈধ মাছের ঘেরের চাপে হারিয়েছে তার স্বাভাবিক রূপ। বছরের পর বছর দখল আর অব্যবস্থাপনায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে এর নাব্যতা ও প্রবাহ। সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদীর গতিপথ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করে নদীর ভেতরেই এসকেভেটর দিয়ে মাটি তুলে ঘের তৈরি করা হচ্ছে। কোথাও আবার আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে পুরো প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এ জলধারাটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী রক্ষায় নেয়া আইনি পদক্ষেপ বাস্তবে কোনো কার্যকর ফল আনতে পারেনি। বরং মামলা চলমান থাকা অবস্থায়ও দখলদাররা আরও শক্ত অবস্থানে গিয়ে নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে। নদীর দুই তীর ও মাঝখান দখল করে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক মাছের ঘের। এতে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হামিদ বলেন, একসময় এই নদী ছিল জীবন্ত। এখন বোঝাই যায় না এখানে একটা নদী ছিলো।
হোসেন আলী অভিযোগ করেন, দখলদাররা এই নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে, আর নদীর ভেতরে নতুন করে এসকেভেটর চালিয়ে ঘের তৈরি করা হচ্ছে।
হাফিজুর রহমান জানান, প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে নদীর জমি দখল করে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছে। মামলার পরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে ২০ বছর ধরে এ এলাকায় বোরো ধান আবাদ হয় না। বছরে একবার এখানকার মানুষ আমন চাষ করে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কাজল হোসেন জানান, সরকার যে খাল খনন কাজের উদ্যোগ নিয়েছে তাতে কোনই সুফল আসবে না এ এলাকার জন্য। যদি এই নদীর বাধ কেটে মুখ ছাড়ানো না হয়।
মিজানুর বিশ্বাস বলেন, ২০২১ সালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন তৎতকালীন জেলা প্রশাসক। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার আসামিরাই এখন নদী ও সংযোগস্থলে নতুন করে বাঁধ ও ঘের তৈরি করছে।
তিনি আরও জানান, যে মামলা নদী রক্ষার জন্য হয়েছিল, সেই মামলার আসামিরাই এখন দখল ও নিয়ন্ত্রণে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। এতে নদী উদ্ধারের উদ্যোগ কার্যত ব্যর্থ হয়ে পড়েছে। নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজামপুর ও শিমুলিয়া ইউনিয়নসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি নদীর মাঝ খানে এসকেভেটর দিয়ে নদীর পাড় বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
এ বিষয়ে ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাফফাত আরা সাঈদ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদার জানান, নদী দখল ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, নদী দখলমুক্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকে যে মামলাটি করা হয়েছিলো। সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। যেন অবৈধ দখলকারীরা কোন সুযোগ না পায়।
তবে স্থানীয়দের শঙ্কা, দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়া না হলে ভায়না নদী বাস্তবে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে কৃষি ও পরিবেশে।
