যশোরের ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদ শুধু একটি জলধারা নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একসময় যে নদী নৌ-যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নগরজীবনের প্রাণ ছিল, আজ সেই নদীর বড় অংশ পরিণত হয়েছে স্থির পানির জলাধারে। কচুরিপানায় আচ্ছাদিত, কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির এই বাস্তবতা শুধু একটি নদীর সংকট নয়, এটি আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিরও একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।
ভৈরব পুনর্জীবনের লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। কিন্তু প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নৌ-চলাচল সচল করা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা—বাস্তবে অর্জিত হয়নি। তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রকৃত সুফল কোথায়?
উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা কখনো খনন করা কিলোমিটার বা ব্যয় করা টাকার অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে প্রকল্পের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে তার ওপর। যদি নদীতে স্রোত না ফেরে, যদি পানি স্থির হয়ে দূষিত হয়, যদি কচুরিপানা নদী দখল করে নেয় এবং নৌ-চলাচল বন্ধই থাকে, তবে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলেও তার উদ্দেশ্য যে পূরণ হয়নি, তা স্পষ্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগ এবং পরিবেশকর্মীদের পর্যবেক্ষণ থেকে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর মূল চ্যানেল যথাযথভাবে খনন না হওয়া, উজানের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপনে ব্যর্থতা, সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্টের কারণে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা না থাকা-এসবই প্রকল্পের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নদী কেবল মাটি কেটে গভীর করলেই জীবিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ভৈরব এখন দূষণেরও শিকার। হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য এবং বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নদীতে যখন স্বাভাবিক স্রোত থাকে না, তখন এসব দূষণকারী উপাদান নদীতেই জমে থেকে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। এটি শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের নয়; স্থানীয় সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি ও পৌর কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোরও যৌথ দায়িত্ব।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্যে সমাধানের চেয়ে দায় এড়ানোর প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান। কেউ বলছে সেতু-কালভার্ট সমস্যা, কেউ বলছে অন্য সংস্থার দায়িত্ব। অথচ একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এবং পরে আন্তঃসংস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করাই ছিল সবচেয়ে বড় শর্ত। জনগণের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে এই সমন্বয়ের অভাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয়, কার্যকর উদ্যোগ। ভৈরব নদ প্রকল্পের একটি স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন হওয়া উচিত। কোথায় পরিকল্পনার ত্রুটি ছিল, কোথায় বাস্তবায়নে ঘাটতি হয়েছে এবং কী কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি-তা নিরপেক্ষভাবে নির্ণয় করতে হবে।
একই সঙ্গে উজানের সঙ্গে নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন, প্রতিবন্ধক সেতু ও কালভার্ট
পুনর্র্নিমাণ, নিয়মিত ড্রেজিং, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
ভৈরবের ভবিষ্যৎ শুধু একটি নদীর ভবিষ্যৎ নয়; এটি যশোর অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জলাবদ্ধতা নিরসন, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের পরও যদি নদী তার প্রাণ ফিরে না পায়, তবে সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে-কাগজে নয়, বাস্তবের ভৈরবকে আবার প্রবহমান করে।
