বাংলার ভোর প্রতিবেদক
ঈদের সকাল মানেই স্বজনদের সান্নিধ্য। আর মেয়ের বাড়িতে প্রথমবার ঈদ করার আনন্দ তো অন্য রকম। সিরাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমও সেই আনন্দ বুকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন ঘর থেকে। তাদের চোখে ছিল মেয়ের সঙ্গে দেখা করার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পথেই থমকে দাঁড়াল মর্মান্তিক এক রেল দুর্ঘটনায়। কুমিল্লার পাদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে এই দম্পতি।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২১ মার্চ, ঈদের দিনে। যশোরের চৌগাছা উপজেলার আজমতপুর গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ও কোহিনুর বেগম অনেক স্বপ্ন নিয়ে মেয়ে ফারহানা সুলতানা শেফার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রতনকাটি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। জীবনে প্রথমবারের মতো ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে মেয়ের কাছে যাচ্ছিলেন তারা। চড়েছিলেন চৌগাছা থেকে ছেড়ে আসা ‘মামুন পরিবহন’-এর একটি বাসে।

কিন্তু নিয়তি তাদের জন্য লিখে রেখেছিল অন্য এক চিত্রনাট্য। কুমিল্লা পাদুয়ার বাজার রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সঙ্গে বাসটির প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই বাসটি পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে। বাসের ১২ জন যাত্রীসহ সিরাজুল-কোহিনুর দম্পতিও ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

রাত ৩টার পর থেকেই সিরাজুল ও কোহিনুরের মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উদ্বেগে থাকা স্বজনরা যখন হন্যে হয়ে খোঁজ নিচ্ছেন, তখনো হয়তো তারা জানতেন না যে যাদের তারা খুঁজছেন, তারা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। পরে মেয়ের জামাই যখন মর্গে গিয়ে শাশুড়ি ও শ্বশুরের নিথর দেহ শনাক্ত করেন তখন আর পৃথিবীতে তাদের শোক ধারণ করার মতো ভাষা ছিল না।

যশোরের আজমতপুর গ্রামে এখন শোকের মাতম। যে বাড়িতে তাদের ফেরার কথা ছিল উৎসবের আমেজ নিয়ে, সেই বাড়িতেই এখন শোকের ছায়া।

পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা কোনোদিন মেয়ের বাড়ি ঈদ করতে যাননি। এটিই ছিল তাদের প্রথম সফর। অথচ সেই সফরই হয়ে উঠল তাদের জীবনের শেষ যাত্রা।

নিহত সিরাজুলের মেজো ভাই নুর ইসলাম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, ভাই আর ভাবি এই প্রথম ঈদে মেয়ের বাড়ি যাচ্ছিল। অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের। কিন্তু আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তা তো আর বদলানো যায় না। আমাদের পরিবারের সব আনন্দ এক নিমেষেই মুছে গেল।

সোমবার (২৩ মার্চ) সকাল ১০টায় আজমতপুর গ্রামে তাদের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। যে জীবনে তারা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাটিয়েছেন, মৃত্যুর পরেও তাদের শেষ ঠিকানা হলো পাশাপাশি দুটি কবরে।

একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নিল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন। যে মেয়ের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে লক্ষীপুরে যাচ্ছিলেন সিরাজুল-কোহিনুর দম্পত্তি সেই মেয়ে এসে শেষ বারের মত দেখে দাফন করলেন বাবা মাকে। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির বদলে শেষ বারের মত ছয় মুঠো মাটি দিলেন দুটি কবরে। আজমতপুরের বাতাস আজ ভারি হয়ে আছে স্বজন হারানোর এই হাহাকারে।

Share.
Exit mobile version