শরিফুল ইসলাম
‘আগে সারাদিন যে পরিমাণ তেল বিক্রি করতাম এখন তার থেকেও বেশি বিক্রি করছি, তাও আবার মাত্র কয়েক ঘন্টায়। এত তেল যাচ্ছে কোথায় ?’ আক্ষেপ নিয়ে যশোরের একটি প্রসিদ্ধ পেট্রল পাম্পের ব্যবস্থাপক বলছিলেন কথাগুলি। তার এ কথার সূত্র ধরে জ্বালানি তেলের খুচরা বাজারে চরম অরাজক পরিস্থিতির খোঁজ নিতে গিয়ে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

যশোরসহ সারাদেশেই পেট্রোলপাম্পগুলো দীর্ঘ লাইন আর সাধারণ মানুষের হতাশার নেপথ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে শক্তিশালী মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এ চক্র প্রকাশ্যেই তেল সংগ্রহ করে তা বেশি দামে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোন পাম্পে তেল দেয়া হচ্ছে এটা জানার পর মোবাইলে যোগাযোগের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই এ চক্রের সদস্যরা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ করে ফেলছে তেল সংগ্রহের লাইন। কখনো কখনো পাম্পের কর্মচারীদের কাছ থেকে তেল দেয়ার সময় জেনে নিয়ে তার কয়েক ঘন্টা আগে থেকেই লাইন দিচ্ছে।

সোমবার সরেজমিনে যশোর শহরের বিভিন্ন পেট্রোলপাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ১০টা থেকে তেল বিক্রি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোর থেকেই দেয়া হয়েছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। অনেক ক্ষেত্রে সেই লাইন কয়েকশ মিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় এবং পাম্প কর্মচারীদের দাবি, লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেলের বড় একটি অংশই পেশাদার ‘তেল সংগ্রহকারী’ চক্রের সদস্য।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সদস্যরা একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার তেল সংগ্রহ করছেন। একবার তেল নেয়ার পর তারা কাছাকাছি ভিন্ন পাম্প বা একই পাম্পে পোশাক পরিবর্তন করে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। পরে সারাদিন ধরে সংগ্রহ করা তেল বেশি দামে শহর বা শহরতলীর বিভিন্ন স্থানের খোলা বাজারের বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছে। এমন অবস্থায় চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন পেট্রোলপাম্প মালিকরা।

এছাড়া তেলের সংকটের আশঙ্কায় অনেক সাধারণ চালকও বারবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন অন্তত নিজের মোটরসাইকেলের ট্যাংকটি পূর্ণ করার জন্য। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এতে করে চলতি পথের বা প্রকৃত প্রয়োজনীয় গ্রাহকরা সময়মতো তেল পাচ্ছেন না।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরের কয়েকটি পেট্রোলপাম্প কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কোনো কোনো পাম্পে তেল দেয়ার সময় মোটরসাইকেলের টায়ারে রং দিয়ে চিহ্ন দিয়ে দিচ্ছে। যাতে একই গাড়ি বারবার তেল নিতে না পারে। তবে তাতেও পুরোপুরি কাজ হচ্ছে না। চালকরা পাশের অন্য পাম্পে গিয়ে আবার তেল সংগ্রহ করছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পাম্পে তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রাহকদের তেল না দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। পরে সেই তেল চড়া দামে বিক্রি করছেন ওই চক্রের সদস্যদের কাছে। সম্প্রতি যশোরের একাধিক পেট্রোলপাম্পে এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসন জরিমানাও করেছে।

পেট্রোলপাম্প সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা বলছেন, তারা অনেকটা অসহায় অবস্থায় কাজ করছেন। একজন কর্মচারী জানান, “একই ব্যক্তি দিনে কয়েকবার তেল নিচ্ছেন। যদি একবারের বেশি তেল দেয়া বন্ধ করা যেত, তাহলে প্রকৃত চালকরা বঞ্চিত হতেন না।”

যশোর অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি না থাকলেও কৃত্রিমভাবে চাহিদা বাড়িয়ে সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ডিপো থেকে নিয়মিত তেল সরবরাহ থাকলেও খুচরা পর্যায়ে এসে তা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে।

খুলনার পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোর তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় তেলের সরবরাহ খুব একটা কমেনি। তবে বর্তমানে বাজারে চাহিদা কয়েকগুণ বেশি দেখানো হচ্ছে। রেশনিং পদ্ধতিতে ডিলার ও এজেন্টদের তেল দেওয়া হলেও খুচরা পর্যায়ে গিয়ে তার নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।

এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা একটি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার বা মোবাইল অ্যাপ চালু করে প্রতিটি যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর তেল নেয়ার সীমা নির্ধারণ করা হবে। এতে একজন চালক একবার তেল নেয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের আগে অন্য কোনো পাম্প থেকে তেল নিতে পারবেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সিণ্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির চরমে পৌঁছে দেবে।

যশোর জেলা ফুয়েল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহির হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পাম্প ব্যবসায় জড়িত থেকে এটুকু বলতে পারি ইদানিং যেসব মোটরসাইকেল চালক তেল সংগ্রহ করছেন তাদের অধিকাংশকেই আমরা চিনিনা। এসব মোটরসাইকেল কোথা থেকে আসছে বুঝতেও পারছি না। আর তেল নিয়েই বা তারা কিরছে তাও জানিনা। তিনি এ সিণ্ডিকেট রুখতে প্রয়োজনে তেলের দাম কমানোর জন্যও বলেন।

তিনি দাবি করেন এ মুহূর্তে তেলের দাম কমিয়ে দিলে এ সিণ্ডিকেট বড় ধরনের লোকসানে পড়বে তাতে করে স্বস্তি ফিরবে খুচরা বাজারে। যদিও তা প্রায় অসম্ভব। আর তা না হলে এ সিণ্ডিকেটের চাহিদা অনুযায়ি তেলের দাম বাড়াতে হবে। যাতে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় আঘাত আসবে।

এছাড়া তিনি দাবি করেন প্রশাসন যদি এ চক্র সনাক্তে পাম্পে স্থাপিত সিসি টিভি চেক করে মোটরসাইকেলে তেল সংগ্রহকারী চক্রকে আটক করে তবে হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। একই সাথে তিনি জানান, তারা আগে যে তেল নিয়মিত বিক্রি করতে তার থেকে বেশি তেল আনার পরও তা মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

Share.
Exit mobile version