বাংলার ভোর প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র আটদিন বাকি। ইতোমধ্যে জমে উঠেছে যশোরের পশুর হাটগুলো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতারা জেলার বিভিন্ন পশুর হাটে আসছেন গরু ও ছাগল কিনতে। তবে জেলার অধিকাংশ পশুর হাটের ইজারা ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে সুকৌশলে এসব হাট ইজারা নেয়া হয়েছে।

যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলায় মোট ১৯টি পশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ছয়টি, কেশবপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শায় একটি করে, মণিরামপুরে তিনটি, অভয়নগরে দুটি এবং বাঘারপাড়ায় চারটি পশুর হাট রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শার্শা উপজেলার সবচেয়ে বড় পশুর হাট ‘সাতমাইল পশুর হাট’। এই হাটকে কেন্দ্র করে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। হাটটির সর্বশেষ বার্ষিক ইজারা মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাটটির আর বার্ষিক ইজারা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার টেণ্ডার আহ্বান করা হলেও সাড়া মেলেনি।

বার্ষিক টেণ্ডারে কেউ অংশ না নিলেও উন্মুক্ত নিলাম বা দৈনিক ডাকে আগ্রহ দেখিয়েছেন অনেকেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হাটটির উন্মুক্ত নিলাম নেন বাবু নামের এক ব্যবসায়ী। সাড়ে সাত কোটি টাকার ইজারা মূল্য কমে ১৪৩২ বঙ্গাব্দে তিনি ৩ কোটি ৩১ হাজার টাকায় হাটটি নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়ভাবে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তার হয়ে হাটটি নিয়ন্ত্রণ করতেন বাগআঁচড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির।

পরবর্তীতে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দরপত্র বিক্রি হলেও কোনো ইজারাদার তা জমা দেননি। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল উন্মুক্ত ডাকে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে কুদ্দুস আলী বিশ্বাস এক বছরের জন্য ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকায় হাটটির ইজারা লাভ করেন। তিনি শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক বছর আগের সাড়ে সাত কোটি টাকার ইজারা মূল্যের সঙ্গে বর্তমান হিসাব তুলনা করলে সরকার অন্তত সাড়ে তিন কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি সরকার বঞ্চিত হচ্ছে ২৫ শতাংশ ভ্যাট ও আয়কর থেকেও।

ইজারাদার কুদ্দুস আলী বিশ্বাস দাবি করেন, নিয়ম মেনেই সর্বোচ্চ দর দিয়ে তিনি ইজারা নিয়েছেন। তিনি বলেন, “গত বছর প্রতি হাটে উপজেলা প্রশাসন পেত তিন লাখ ৩১ হাজার টাকা করে। এবার থেকে প্রতি হাটে প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা পাবে। অর্থাৎ প্রতি হাটে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বেশি রাজস্ব আসবে।

ইজারার বিষয়ে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ গণমাধ্যমকে বলেন, “যশোরের সবচেয়ে বড় হাট সাতমাইল। এখানে পাঁচদিন আমরা খাস আদায় করেছি। কিন্তু স্থানীয় কোনো সহযোগিতা পাইনি। রাজনৈতিক গ্রুপিং থাকলেও হাটের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে মিল দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে বেপারিদের ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। হাটে গরু উঠতে দেয়া হয়নি। এমনও হয়েছে, এক হাটে মাত্র ৬০ হাজার টাকা নিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

এদিকে সূত্র জানিয়েছেন, যশোরের চৌগাছা পশুর হাট ইজারা নিয়েছেন বিএনপির আতাউর রহমান লাল। তিনি উপজেলার বিএনপির সহ-সভাপতি। অন্যদিকে যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর পশুর হাটও নিয়ন্ত্রণে বিএনপির। বিএনপির নেতা সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম এ হাট ইজারা নিয়েছেন।

এদিকে, চলতি বছর যশোরে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি পশু। জেলার চাহিদা ১ লাখ ৩ হাজার ১২৮টি হলেও উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় ১৪ হাজার ৮৪৯টি পশু। বর্তমানে জেলায় খামারির সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৪০ জন। প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে ২৮ হাজার ৮৪৪টি ষাঁড়, ৩৬ হাজার ২৫৯টি গাভী, ৮১ হাজার ২৭৬টি ছাগল এবং ৪৪২টি ভেড়া।

নওয়াপাড়া ইউনিয়নের খামারি রিয়াজ মাহামুদ বলেন, আগে যেখানে একটি গরু মোটাতাজা করতে যে খরচ হতো, এখন একই গরুর পেছনে কয়েক হাজার টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা বেশি বিপদে পড়েছেন। কেউ খামারের আকার ছোট করছেন, আবার অনেকে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন।

আরেক খামারি মিলন হোসেন বলেন, খাদ্যের দাম এত বেড়েছে যে খামার চালানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর ওপর ভ্যাকসিন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বেশি দামে বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে, যা বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দীকুর রহমান বলেন, যশোরের কোরবানির পশু স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় যশোরের পশুর চাহিদা বেশি।

তিনি আরও বলেন, খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তাই দানাদার খাদ্যের পরিবর্তে বেশি করে সবুজ ঘাস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ না করার বিষয়েও আমরা নিশ্চিত হয়েছি।

Share.
Exit mobile version