হিমেল খান :
টানা মুষলধার বৃষ্টিতে যশোর শহরে অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি শুক্রবার দুপুর ১ টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলায় সড়ক, বাসা-বাড়ি, হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেনে শহরবাসী।
এদিকে, রাতের টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন এলাকার বাসিন্দারা সকালে জীবিকার তাগিদে বের হতে পারেননি। তারা এ সময় নিজের ঘর বাঁচানোর পাশাপাশি সন্তানদের নিরাপদে রাখতে ব্যস্ত সময় পার করেন। একই সাথে কেউ কেউ জলমগ্ন রাজপথে জাল নিয়ে মাছ ধরতে নেমে পড়েন। যা দেখে মনে হতে থাকে এ যেন এক দীর্ঘ নদী।
আর নদী পাড়ের বাসিন্দারা নদীর উপচে পড়া পানিতে নিমজ্জিত। এদিন এলাকার বাসিন্দাদের ঘরে জ্বলেনি চুলাও। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নির্দেশের জেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দ পানিবন্দি মানুষের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান করে।
নগরবাসীর অভিযোগ, শহরের পানি নিস্কাশনের প্রধান উৎস পরিস্কার না করায় এই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। প্রতিবছরের মতো এবারও সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে পৌরসভা কর্মকর্তারা দিচ্ছেন সেই পুরাতন আশ্বাস। তারা বলছেন, পানি নামার সময় দিতে হবে। সন্ধ্যার মধ্যেই নেমে যাবে সব পানি।
যশোর বিমান বাহিনীর মতিউর রহমান ঘাঁটির আবহাওয়া দফতরের সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত যশোরের ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকোর্ড করা হয়েছে। বিরতিহীনভাবে চলা এই বৃষ্টিতে যশোর পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। শহরের রাস্তা ও বাড়ি-ঘরে পানি জমে গেছে।
পানিতে বিকল হচ্ছে যানবাহন, ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থসেবা, ডুবে গেছে হাসপাতালও। ভোগান্তিতে পড়েছেন ভর্তি রোগীদের স্বজনরা। একই সঙ্গে অভয়নগরের নওয়াপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অংশেও পানি ঢুকে পড়েছে। এতে রোগী, চিকিৎসক ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শহরের ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হয় শহরের দক্ষিণের হরিণার বিল হয়ে মুক্তেশ্বরী নদীতে। আর মহল্লার ভিতরের ছোট ড্রেন দিয়ে এ পানি গিয়ে পড়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বড় একটি ড্রেনে। সেখান থেকেই পানি শহরের বিল হরিণাই কথা। কিন্তু এই পানি নিস্কাশনের প্রধান ড্রেনটির মুখ সরু ও দীর্ঘদিন পরিস্কার না থাকায় স্বাভাবিকভাবে নিস্কাশন হতে পারছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
এদিকে শহর ঘুরে দেখা যায়, শহরের ৪ নং কাজীপাড়া, ৫নং খড়কি কারবালা, ৬ নং চাঁচড়া, ৭ শংকরপুর ও ৯ নং বকচর ও নাজীর শংকরপুরের শেষ সীমানা এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে ডুবে গেছে।
শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, এই এলাকার একটি মাত্র ড্রেন রয়েছে। সেখান দিয়েই শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের পানি বের হয়। কিন্তু ড্রেনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিস্কারা করা হয় না।
একই এলাকার বাসিন্দা কামাল জানান, ড্রেনটি খুবই ছোট হওয়ায় বর্ষার পানি দ্রুত বের হতে পারে না।
এদিকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি হোটেল তলিয়ে গেছে পানিতে। হোটেল ব্যবসায়ী মইনুদ্দিন বলেন, মহল্লার ড্রেন উপচে পানি হোটেলের ভেতরে ঢুকে গেছে। হোটেল বন্ধ রেখে পানি সেচতে হচ্ছে তাকে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা।
আরেক বাসিন্দা নাছিমা বেগম জানান, টানা বৃষ্টিতে তার ঘরের ভেতরে পানি উঠে গেছে। বারবার পানি সেচেও কোন প্রতিকার মিলছে না।
এদিকে বরাবারের মতোই আশ্বাস দিচ্ছেন যশোর পৌরসভা। পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু বলেন, শহরের পানি নিস্কাশনের জন্য একটি মাত্র প্রধান ড্রেন থাকায় পানি নামতে সময় লাগছে। তার দাবি, সন্ধ্যার মধ্যেই জমে থাকা পানি নেমে নিস্কাশন হয়ে যাবে।
অটো বাইক চালক রিয়াজ হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে গাড়ি নিয়ে রাস্তা নামতে পারছেন না তিনি। একবেলা আয় না হলে সংসার চালানো দায় হয়ে ওঠের তার। এ কারণেই তিনি গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন রাস্তায়। এদিকে রাতায় পানির কারণে ক্ষতি হচ্ছে তার গাড়ির।
এদিকে খুলনা আবহাওয়া অফিস জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত অতি ভারি বর্ষণ হয়েছে যশোরে। এছাড়া আগামী ৪৮ ঘণ্টা ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে আশঙ্কা করছেন তারা।
ভোগান্তির শিকার মানুষের অভিযোগ শহরে পানি নিস্কাশনের ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে আছে, তাই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে জনবসতিতে।
এদিকে সচেতন নাগরিকরা বলছেন যশোর পৌরসভা শত কোটি টাকা খরচ করেও কোন সুফল মেলেনি নগরবাসীর। এতে জলাবদ্ধতা বাড়ার পাশাপাশি নগরবাসীর দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতের টানা বর্ষণে ডুবেছে, ঝিকরগাছা, কেশবপুর, মণিরামপুর অভয়নগরের বিভিন্ন এলাকা। ডুবেছে নওয়াপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও। এতে ব্যাহত হয় স্বাস্থসেবা, দুর্ভোগে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা।
