বাংলার ভোর প্রতিবেদক
আসন্ন ঈদুল আজহায় যশোরের কুরবানির পশু লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৭ হাজার সরকারিভাবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের গড়মিল ফুটে উঠেছে। সরকারি তালিকার সংখ্যার সঙ্গে খামারগুলোর প্রকৃত পশু সংখ্যার বিস্তর অমিলের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে গবাদিপশুর খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও খুরা রোগের ভ্যাকসিন সংকটে খামারিরা চরম চাপে রয়েছেন। ফলে কুরবানির হাটে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন খামারিরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর যশোরে কুরবানির জন্য ১ লাখ ১৭ হাজার পশুর চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে গরু ৩৬ হাজার এবং ছাগল ৮১ হাজার। গত বছর জেলায় কুরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৭৪টি পশু। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এ বছর চাহিদার তুলনায় পশু বেশি থাকবে এবং স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তবে সরেজমিনে খামার ঘুরে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। সদর উপজেলার রামনগর এলাকার একটি খামারে সরকারি তালিকায় ৩৬টি গরুর উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ১৫টি। একইভাবে ফতেপুর ইউনিয়নের একটি খামারে তালিকায় ৬৫টি পশুর কথা থাকলেও সেখানে রয়েছে মাত্র ১০টি। অনুসন্ধানে একাধিক খামারে একই ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, যা তালিকা প্রণয়ন ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

খামারিরা জানান, গবাদিপশুর খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় খামার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। খড়, ভূসি, খৈল ও প্রস্তুত ফিডের দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রতিদিনের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু বাজারে কুরবানির পশুর দাম সেই হারে বাড়ছে না।

ফলে অনেক খামারি লোকসানের আশঙ্কায় খামার ছোট করছেন কিংবা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে আসছেন।

নওয়াপাড়া ইউনিয়নের এক খামারি রিয়াজ মাহামুদ বলেন, আগে যেখানে একটি গরু মোটাতাজা করতে যে খরচ হতো, এখন একই গরুর পেছনে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। কেউ কেউ খামারের আকার ছোট করছেন, আবার অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন।

খামার ব্যবস্থাপক মিলন হোসেন বলেন, খাদ্যের দাম এত বেড়েছে যে খামার চালানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর ভ্যাকসিন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বেশি দামে বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

এর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে খুরা রোগের ভ্যাকসিন সংকট। খামারিদের দাবি, সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে বাজার থেকে বেশি দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করছেন। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি রোগ প্রতিরোধে অনিশ্চয়তাও থেকে যাচ্ছে। অনেক খামারি আশঙ্কা করছেন, সময়মতো ভ্যাকসিন না পেলে খামারে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফারুক হোসেন বলেন, খুরা রোগের ভ্যাকসিনের জন্য ৪ হাজার ডোজের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো সরবরাহ পাওয়া যায়নি। সরবরাহ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খামারিদের মধ্যে তা বিতরণ করা হবে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দীকুর রহমান বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর জেলায় কুরবানির পশুর সংখ্যা বেড়েছে এবং স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে সরকারি তালিকার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের গড়মিলের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।

তিনি আরও বলেন, খামারিদের কাঁচা ঘাসভিত্তিক পদ্ধতিতে গরু ও ছাগল মোটাতাজাকরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এতে একদিকে খরচ কমে, অন্যদিকে পশু প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা সম্ভব হয়।

Share.
Exit mobile version