শরিফুল ইসলাম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ যশোর অঞ্চল ইসলামের ইতিহাসে এক সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৩শ শতাব্দীতে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনার পর থেকেই যশোর, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসলামের ধীরে ধীরে বিস্তার ঘটে। নদী-নালা ও বনাঞ্চলবেষ্টিত এই অঞ্চলে সুফি সাধক, মুসলিম প্রশাসক এবং বণিকদের আগমন ইসলামের প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় ইসলামের বিস্তারে সর্বাধিক অবদান রাখেন প্রখ্যাত সুফি সাধক খান জাহান আলী (রহ.)। তিনি খুলনা-যশোর অঞ্চলে মসজিদ, দীঘি, সড়ক ও বসতি স্থাপনের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত সমাজ গড়ে তোলেন। তাঁর মানবিক দাওয়াত, সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের কারণে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। তাঁর কার্যক্রমের প্রভাব যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আজও ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে।

সুলতানি আমলে বাংলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইসলামের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করে। বিশেষত শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ-এর শাসনামলে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুসলিম প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ধারাবাহিকতায় যশোর অঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এই সময় ইসলাম শুধু ধর্মীয় চর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে।

পরবর্তীকালে মুঘল শাসনামলে যশোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। নদীপথনির্ভর বাণিজ্যের কারণে আরব ও পারস্যের বণিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, যা ইসলামী সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখে। মুঘল আমলে অঞ্চলে মসজিদ নির্মাণ, মক্তব ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। ফলে ইসলাম এই অঞ্চলের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত প্রাচীন মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে কেশবপুরের ঐতিহাসিক শেখপুরা জামে মসজিদ এবং অভয়নগর উপজেলার শুভরাড়া গ্রামের প্রাচীন খানজাহান আলী (রহ.) মসজিদ, শুভরাড়া উল্লেখযোগ্য। এসব স্থাপনা শুধু ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং ইসলামী স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার প্রতীক।

ব্রিটিশ শাসনামলেও যশোর অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত ছিল। স্থানীয় আলেম-উলামা, মাদ্রাসা ও মক্তবের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার লাভ করে এবং সমাজে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজে খানকাহ, ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইসলামী সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যশোর অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে অসংখ্য মসজিদ, কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা, ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় সংগঠন ইসলামের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে ভূমিকা রাখছে। রমজান, ঈদ, মিলাদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় মাহফিলকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে ব্যাপক ধর্মীয় চর্চা পরিলক্ষিত হয়।

সামগ্রিকভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক দাওয়াত, সুলতানি ও মুঘল শাসনের প্রশাসনিক কাঠামো, নদীপথকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ—এই চারটি উপাদান যশোর অঞ্চলে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল ইসলামী ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তার স্বকীয় অবস্থান বজায় রেখেছে।

Share.
Exit mobile version