বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যাত্রী সংকটের কারণে যশোর-ঢাকা রুটে সব ধরনের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। বৃহস্পতিবার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে যশোর বিমানবন্দর থেকে সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করবে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রী কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, ট্রাভেল এজেন্সি ও পরিবহন খাতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। রাজধানীর সঙ্গে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় অধিকাংশ যাত্রী এখন সড়ক ও রেলপথকেই বেছে নিচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যশোর-ঢাকা আকাশপথে। এক সময় যাত্রী চাহিদা বেশি থাকলেও বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
যশোর বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ বিমান, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, জিএমজি এয়ারলাইন্স ও ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ মিলিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮টি ফ্লাইট ওঠানামা করত। কিন্তু বিভিন্ন এয়ারলাইন্স পর্যায়ক্রমে এ রুট থেকে সেবা গুটিয়ে নেয়ায় গত বুধবার পর্যন্ত সপ্তাহে মাত্র নয়টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছিল। সর্বশেষ ইউএস-বাংলাও ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়ায় এখন কেবল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সপ্তাহে দুই দিন, মঙ্গলবার ও শুক্রবার একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করবে।
এদিকে, যাত্রীদের সুবিধার্থে ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই যশোর বিমানবন্দরে আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল ভবনের উদ্বোধন করা হলেও প্রত্যাশিত যাত্রী না থাকায় সেই অবকাঠামোর পূর্ণ সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ফ্লাইট বন্ধের খবরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ট্রাভেল এজেন্সি, ভাড়ায় চালিত গাড়িসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তারা বলছেন, বিমানে যাত্রী কমে যাওয়ায় তাদের আয় আগেই কমে গিয়েছিল। এখন ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় ব্যবসা আরও সংকুচিত হবে। অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন।
তবে যাত্রীরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে পরিবর্তন এসেছে। রাজধানীর সঙ্গে যশোরের যাতায়াতের দূরত্ব কমেছে। অন্যদিকে বিমানের ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দিন দিন আগ্রহ কমছে তাদের।
রাশেদ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, তিনি ব্যবসায়ীক প্রয়োজনে বিমানে যাতায়াত করতেন। কারণ সকালে ঢাকায় যেয়ে কাজ শেষে তিনি সন্ধ্যায় যশোরে ফিরতেন। এখন পদ্ম সেতুর কারণে সকালে ঢাকায় যেয়ে রাতেই ফিরছেন তিনি।
নাইম উদ্দিন নামে শহরের এক বাসিন্দা বলেন, এখন সড়ক পথে যেমন সময় কমেছে তেমনি ভাড়াও তুলনামূলক কম হওয়ায় বিমানের প্রতি আগ্রহ কমেছে। তাদের দাবি, অন্যান্য অভ্যন্তরীণ রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া পুননির্ধারণ করা গেলে যাত্রী সংখ্যা আবারও বাড়তে পারে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, যাত্রী কমে যাওয়ায় এই রুটে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিন লোকসান গুণতে হওয়ায় আপাতত ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাত্রী চাহিদা বাড়লে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুনরায় ফ্লাইট চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিমানবন্দর এলাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন বাদশা বলেন, একসময় প্রতিদিন ১৮টিরও বেশি ফ্লাইট পরিচালিত হতো। ধীরে ধীরে তা কমে এখন দিনে একটি ফ্লাইটে নেমে এসেছে। এতে ট্রাভেল এজেন্সি ও পরিবহন খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত টিকিটমূল্যের কারণেই সাধারণ মানুষ বিমানে যাতায়াতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
অন্যদিকে এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ বলছে, কম যাত্রী নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করতে হওয়ায় ভাড়া কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপক সাব্বির হোসেন বলেন, যশোর-ঢাকা রুটে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা ভাড়া নেয়া হয়। যাত্রী অর্ধেক হওয়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্য ও বিমানবন্দর পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বর্তমান ভাড়ার নিচে নামা কঠিন।
ট্রাভেল এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব যশোরের সাধারণ সম্পাদক অরুণ মজুমদার বলেন, যশোর-ঢাকা রুটে অন্য অভ্যন্তরীণ রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিমানভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করলে যাত্রী আবারও আকাশপথে ফিরবেন বলে তিনি মনে করেন।
যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক তানভীরুল ইসলাম বলেন, দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল, গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে যশোরের গুরুত্ব অপরিসীম। এ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। এছাড়া যশোরের ফুল, সবজি ও কৃষিপণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তাই যশোর বিমানবন্দরকে সচল রাখার পাশাপাশি দ্রুত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।
এদিকে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, যশোর রুটে ফ্লাইট কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো এবং সেবা স্বাভাবিক রাখতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ফ্লাইটের সংখ্যা ও সময়সূচি যাত্রীবান্ধব করা এবং বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কার্গো সুবিধা চালু করা গেলে যশোর বিমানবন্দর আবারও তার আগের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেতে পারে।
