রেহানা ফেরদৌসী
নশ্বর পৃথিবীতে কেউ স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। কেননা মৃত্যু অনিবার্য এবং এটি চিরন্তন সত্য। অনিচ্ছাকৃতভাবে পার্থিব জীবনের অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে যায়, যা শুধরানো হয়ে ওঠে না। মৃতরা কবরে অসহায়। শোধরানোর সুযোগ কবরে আর থাকে না।

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র মাহে রমজান। এই মাসে মহান আল্লাহ জান্নাতের দরজা খুলে দেন, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন। তাই মুমিনের উচিত এই মাসে মৃত প্রিয়জনদের জন্য বেশি দোয়া করা, তাদের কথা স্মরণ করা। যারা একসময় আমাদের সঙ্গে রমজানের দিনগুলো কাটিয়েছেন, সেই প্রিয় মা, বাবা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুকে স্মরণ করা, কেননা তারা একসময় আমাদের জীবনের অংশ হয়ে ছিল। তাদের সান্নিধ্য সময়কে আনন্দময় ও অর্থবহ করত, আমাদের অনুভূতি ও মনকে উজ্জীবিত করত। কিন্তু আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধানে তাদের সময় ফুরিয়ে গেছে, তারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

মাগফিরাতের এই মাসে তাদের ভুলে গেলে চলবে না। পূর্ববর্তীদের জন্য দোয়া করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। রমজানের দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাতময়। মাগফিরাতের এই দশ দিনে আল্লাহতায়ালা অগণিত বান্দাকে ক্ষমা করেন। মাগফিরাতের এই সময়ে নিজেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি মৃত আত্মীয় স্বজনদরে জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের সময় ও রাতে আল্লাহ বান্দাদের ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। তাই বরকতময় এই সময়ে মৃত আত্মীয়স্বজনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাদের জন্য তা উপকার বয়ে আনবে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, প্রতিটি ইফতারের সময় এবং প্রতি রাতে লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এই ক্ষমার মাসে বেশি বেশি করে দোয়া পাঠ করতে হবে। কবর জিয়ারত করা পুণ্যের কাজ। এতে নিজেদের মৃত্যুর কথা স্মরণ হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া দরূদ পাঠ করে সওয়াব পৌঁছানো যায়। আর রমজান মাসে মৃত নিকটাত্মীয়দের কবর জিয়ারত করে তাদের জন্য সওয়াব পৌঁছানো আরও অধিক পুণ্যের কাজ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে : হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই, যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে, তাদেরকে ক্ষমা করুন।’(সুরা : হাশর, আয়াত : ১০)
রাসুলাল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস চলতে থাকে : সদকায়ে জারিয়া; এমন জ্ঞান, যা মানুষ উপকৃত হয়; আর নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪১১৫)

পবিত্র রমজানে মৃতদের জন্য করণীয় কয়েকটি আমল তুলে ধরা হলো-
মৃতদের ইসালে সওয়াব করার একটি উত্তম পদ্ধতি হতে পারে সদকা। কারো সামর্থ্য থাকলে দান-সদকার মাধ্যমে মৃত আত্মীয়দের ইসালে সওয়াব করা যেতে পারে। মৃতদের জন্য আমরা খুব বেশি বেশি দোয়া করতে পারি, বিশেষ করে সাহরি ও ইফতারের সময় তাদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে মাগফিরাতের দোয়া করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেবেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের মৃতদের জন্য সুরা ইয়াসিন পাঠ করো। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩১২১) অতএব, রমজান যেহেতু কোরআনের মাস, এ মাসে আমরা মৃত আত্মীয়দের ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে বেশি কোরআন তিলাওয়াত করতে পারি। কিন্তু মৃতদের জন্য অর্থের বিনিময়ে কাউকে দিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করানো উচিত নয়। কারো সামর্থ্য থাকলে পবিত্র রমজানে মৃতদের ইসালে সওয়াবের নিয়তে ওমরাহ পালন করা যেতে পারে। সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে এতিম বা গরীবদের খাবার দেওয়া এবং অসহায়দের সাহায্য করা সওয়াব পৌঁছানোর উত্তম উপায়। রমজানের বরকতময় সময়ে, বিশেষ করে ইফতারের সময় বা শেষ রাতে মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও জান্নাত প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহর নামে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে খাদ্যসামগ্রী বা অর্থ কোনো অভাবী মানুষকে দান করা, সদকায়ে জারিয়া হিসেবে মসজিদ বা মাদ্রাসায় সাহায্য করতে হবে । নফল নামাজ ও জিকির করে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির রুহে বখশিয়ে দিতে হবে। রমজানে কবরস্থানে গিয়ে জিয়ারত করে এবং তাদের জন্য দোয়া করতে হবে।

মৃতদের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য দান সদকা করলে তাদের কবরে কাক্সিক্ষত সওয়াব পৌঁছে। আর রমজান মাসে মৃত নিকটাত্মীয়দের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য দান সদকা করলে তারা আরও অধিক বেশি সওয়াব প্রাপ্ত হবে। কেননা রমজানে প্রতিটি নেক কাজের বিনিময়ে সত্তর গুণ বেশি সওয়াব দেওয়া হয়। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ অথবা উমরা আদায় করলে তার সওয়াবও মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। আর সেই সওয়াবের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি কবরে উপকৃত হয়। যদি মৃত আত্মীয়ের রমজানের রোজা কাজা থাকে, তবে জীবিত আত্মীয়দের তা পূর্ণ করা বা কাফফারা আদায় করা উত্তম। তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের জন্য নিয়মিত দুয়া করা। মৃত ব্যক্তির সওয়াবের উদ্দেশ্যে করা সব আমলের সওয়াব আল্লাহ তাআলা তাদের কাছে পৌঁছে দেন।

কবর খুব কঠিন জায়গা। কবরে মানুষের কর্মের যথাযথ প্রতিফল দেওয়া হয়। কবরে নিজের ত্রুটি বিচ্যুতির হিসাব দেওয়া খুবই দুরূহ। তাই মানুষ সেখানে প্রচণ্ড সহায়হীন অবস্থায় নিপতিত হয়। এরকম পরিস্থিতিতে মৃতদের জন্য মাগফিরাত কামনা এবং কল্যাণমূলক কাজ করে সওয়াব পৌঁছানো ব্যতীত আর কোনো উপায় থাকে না। তাই মৃতদের শান্তি ও মাগফিরাতের জন্য দোয়া ও কল্যাণমূলক কাজ করা নিকটাত্মীয়দের ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।

লেখক : সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক)

Share.
Exit mobile version