সোহাগ হোসেন, বাগআঁচড়া
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী- যদুনাথপুর খালটি এখন অতীত। উলাশী জিয়ার খাল নামে পরিচিত খালটি হারিয়ে যাওয়ার পথে। আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় ধ্বংস হয়ে গেছে উলাশী জিয়া মঞ্চ, এবং তিনি যে ঘরে রাতযাপন করতেন সে ভবনটিও।
গত ৫০ বছরে কেউ খোঁজ নেয়নি এ খাল, মঞ্চ ও ঘরের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খননের ঘোষণার পর এ খালটি ফের আলোচনায় এসেছে।

স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর খাল খনন করেন। ১৯ কিলোমিটারের বেতনা নদী দিয়ে বর্ষার পানি নিস্কাশনে সময় বেশি লাগায় দ্রুত সময়ে পানি নিস্কাশনের জন্যে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খনন করেন তিনি। যা উলাশী জিয়ার খাল নামে পরিচিত। এক সময় এই খালের স্বচ্ছ পানি শার্শা উপজেলার হাজার হাজার কৃষকের মুখে হাসি ফুটতো। উত্তর শার্শার সোনামুখি ও বনমান্দারসহ ২২টি বিলের হাজার হাজার একর জমিতে পানি নিস্কাশিত হতো এ খাল দিয়ে। উলাশীর জিয়ার খাল শার্শার ১১টি ইউনিয়নের ১৭২ গ্রামের সাধারণ মানুষের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটায়। অর্ধশত বছরের সেই ঐতিহাসিক ‘জিয়া খাল’ আজ অস্তিত্ব সংকটে।

১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর নিজ হাতে কোদাল নিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করেন এ খালটি। উলাশী খালের মাধ্যমে কয়েক হাজার একর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় এই অঞ্চলে বছরে একাধিকবার ফসল ফলানো সম্ভব হয়। এটি খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলে। জিয়ার ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে খাল খননে ঝাঁপিয়ে পড়েন। খালটি কেবল পানি চলাচলের পথ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাকৃতিক মৎস্য ভাণ্ডার। স্থানীয় জেলে ও ভূমিহীন কৃষকরা এখান থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
স্থানীয় মৎস্যজীবী দিলিপ গোবিন্দ বলেন, একসময় এই খালে জাল ফেললেই রুই সরপুঁটি, চ্যাং শোলসহ নানারকম দেশি মাছ ধরা পড়তো। আমাদের বাপ-দাদারা তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি বলেন, আমরা যারা জেলে সম্প্রদায় ও ভূমিহীন ছিলাম, তাদের অভাবের সংসারে এই খালের মাছই ছিল বড় ভরসা। তিনি বলেন, খালের পানি কমে যাওয়ায় সেই দেশি মাছ এখন অতীত।

উলাশীর এই খাল খনন প্রকল্পের সাথে মিশে আছে শহীদ জিয়ার ব্যক্তিগত আবেগ ও পরিশ্রমের স্মৃতি। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই দিনগুলোর কথা। খাল খননের সময় শহীদ জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতেন। খনন কাজ চলাকালীন তিনি খালের পাড়েই একটি সাধারণ ভবনে রাত্রিযাপন করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের সেই অনাড়ম্বর জীবনযাপন স্থানীয়দের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

পরবর্তীতে ওই ভবনটি সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠক ও কৃষকদের মিলনস্থলে পরিণত হয়। কিন্তু সেই ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। সময়ের বিবর্তনে ভবনের ভেতর থাকা শহীদ জিয়ার ব্যবহৃত ফ্যান, খাট, টেবিল, চেয়ারসহ মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন লুট হয়ে গেছে। সেখানে এখন কেবল পড়ে আছে ভাঙা দেয়াল আর আগাছা। খালের পাড়ে নির্মিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া মঞ্চ’ আজ বিলুপ্তির পথে। যেখানে এক সময় উন্নয়নের শপথ নেয়া হতো। সেই মঞ্চের একদিকে গড়ে তোলা হয়েছে গুচ্ছগ্রাম। অপরদিকে উলাশী ইউনিয়ন ভূমি অফিস। শহীদ জিয়ার স্মৃতি মুছে ফেলতে উলাশী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতারা জিয়ার নামের স্মৃতিফলকটি ভেঙে খালের ভেতর ফেলে দেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, এক সময়ের ভরা যৌবনের সেই খাল আজ বিলুপ্তির পথে। খননের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সংস্কার না হওয়ায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে খালের বুক।

স্থানীয় বিএনপি নেতা বদিউজ্জামাল বদি বলেন, এই খাল দিয়ে সোনামুখি ও বন মান্দারসহ ২২টি বিলের হাজার হাজার একর জমির পানি নিস্কাশিত হতো।

Share.
Exit mobile version