কাজী নূর
আজ ৩০ মে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম-এর ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ।
১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদতবরণ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে জাতি হারায় এক সাহসী সেনানায়ক, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং দেশপ্রেমিক নেতাকে।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মাতা ছিলেন জাহানারা খাতুন। শৈশবের একটি অংশ কেটেছে বগুড়া ও কলকাতায়। পরে পিতার কর্মসূত্রে তিনি করাচিতে চলে যান। সেখানে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন।
সামরিক জীবনে তিনি ছিলেন সাহসী ও দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় আসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন তিনি এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাহসী ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি লাভ করেন ‘বীর উত্তম’ খেতাব।
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ব্রিগেডিয়ার এবং পরে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সময়ের প্রয়োজনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাঁর হাতে গড়া দলটি আজ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি উৎপাদনমুখী রাজনীতির প্রবর্তন করেন এবং কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
জিয়াউর রহমান ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি বিশ্বাস করতেন— একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে জনগণকে উৎপাদন ও উন্নয়নের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাঁর নেতৃত্বে খাল খনন, কৃষি উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন।
সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার উন্নয়নে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষায় গঠন করেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রবর্তনেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। ১৯৭৭ সালে তিনি ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রবর্তন করেন। একইসঙ্গে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে চালু করেন ‘একুশে পদক’।
জিয়াউর রহমান ছিলেন সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তা আজও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাশীল, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁর শাহাদতের পর দেশজুড়ে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল প্রমাণ করেছিল তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। পরদিন দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল— “একটি লাশের পাশে সমগ্র বাংলাদেশ”।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর কর্ম, আদর্শ ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এই মহান নেতা।
তথ্যসূত্রঃ “আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান” — প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য।
