বাংলার ভোর প্রতিবেদক :

‘পরাণের বান্ধব রে’, ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জে যাই’, ‘নারীর কাছে কেউ যায় না’ ও ‘আমার ভাটির গাঙের নাইয়া’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শিল্পী দেশবরেণ্য বাউল সাধিকা কাঙালিনী সুফিয়া। ১১ দিন আগে বাথরুমে পা পিছলে পড়ে তার বাঁ হাত ভেঙে যায়। অর্থাভাবে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে না পেরে প্রথমে ঝাড়-ফুঁক ও গাছগাছড়ার চিকিৎসার ওপরই নির্ভর করতে হয়েছিল তাকে।

অবস্থার অবনতি হলে বুধবার (২৪ জুন) সকালে তাকে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার হাতে প্লাস্টার করেন। পরে বিকেলে তাকে সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুর বিলপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।

এদিকে আর্থিক সংকটের কারণে কাঙালিনী সুফিয়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না—এমন সংবাদ প্রকাশের পর তার সার্বিক চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন। এ সহযোগিতার খবরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই খ্যাতিমান শিল্পী।

বুধবার বিকেলে নিজ বাড়িতে কথা হয় কাঙালিনী সুফিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, দুর্ঘটনার দিন বাড়িতে একাই ছিলেন। বাথরুমে পড়ে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য অচেতন হয়ে পড়েন। রাতে জ্ঞান ফিরলে বাঁ হাতে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন এবং হাত নাড়াতে পারছিলেন না। ওই অবস্থাতেই রাত কাটাতে হয় তাকে।

তিনি বলেন, “সেদিন ঘরে কোনো টাকাও ছিল না। পাশে ছিল না আমার একমাত্র মেয়ে পুষ্পও। তাই ঝাড়-ফুঁক আর গাছগাছড়ার চিকিৎসাই ছিল আমার একমাত্র ভরসা। তবে গত কয়েক দিনে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করছিলাম।”

পরদিন সকালে প্রতিবেশী নারী বিবি হাওয়ার কাছে গেলে তিনি ঝাড়-ফুঁক ও কিছু ভেষজ চিকিৎসা দেন। বিবি হাওয়া বলেন, “আমি সামান্য কবিরাজি জানি। মানবিক কারণেই তাকে সাহায্য করেছি।”

কাঙালিনী সুফিয়ার শোবার ঘরে গিয়ে দেখা যায়, একটি সাধারণ চৌকি, চারদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ছড়ানো-ছিটানো কাপড়চোপড়। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই শিল্পীর জীবনযাত্রার এমন চিত্র যে কাউকেই নাড়া দেয়।

কাঙালিনী সুফিয়ার একমাত্র মেয়ে পুষ্প জানান, দুর্ঘটনার তিন দিন পর তিনি ঢাকার সাভার থেকে মায়ের কাছে আসেন। আর্থিক সংকটের কারণে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে স্থানীয় চিকিৎসার ওপরই নির্ভর করতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, “বিষয়টি বিভিন্নজনকে জানিয়েছিলাম। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে বুধবার সকালে মাকে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তার হাতে প্লাস্টার করা হয়।”

পুষ্প জানান, সরকারি উদ্যোগে তার মায়ের নামে ২০ শতাংশ জমি দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে সেখানে দুই কক্ষ ও একটি বাথরুমসহ টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালে ‘সুফিয়া একাডেমি’র জন্য আরেকটি টিনশেড ভবন এবং বার্ষিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একটি উন্মুক্ত মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। তবে এখনো মঞ্চটির ছাদ ও বাউন্ডারি নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি।

তিনি আরও বলেন, “সরকারি উদ্যোগে মা প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা পেতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলা একাডেমি থেকে মাঝে মাঝে কিছু সহযোগিতা পাওয়া যায়। বয়সের কারণে মা এখন আর নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারেন না। ফলে আর্থিক সংকট নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

পুষ্পের মতে, কাঙালিনী সুফিয়ার সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য একজন নার্স বা সহকারী প্রয়োজন। পাশাপাশি তার রচিত প্রায় ৫০০টি গান সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করা জরুরি, কারণ তিনি এখনো নতুন গান রচনা করছেন।

আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনের সহায়তার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “মায়ের অসুস্থতার খবরে তারা পাশে দাঁড়িয়েছে, এটি আমাদের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়। আশা করছি, এবার মা সঠিক চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠবেন।”

রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, “কাঙালিনী সুফিয়ার পাশে প্রশাসন সব সময় রয়েছে। গত ঈদুল আজহায় তাকে ১০ হাজার টাকা এবং হাত ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় আরও ৭ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আমরা তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।”

Share.
Exit mobile version