শরিফুল ইসলাম
পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক জনপদ আরমানিটোলা—সংকীর্ণ গলি, পুরনো স্থাপনা আর শত বছরের স্মৃতিতে ভরপুর এক এলাকা। এই ঐতিহ্যের মধ্যেই আবুল খয়রাত সড়কে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব সৌন্দর্যের এক নিদর্শন—তারা মসজিদ। স্থাপত্যের অনন্যতা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং নান্দনিক কারুকাজের জন্য এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং বাংলাদেশের ইসলামি ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
তারা মসজিদের ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দী পুরনো। ধারণা করা হয়, উনিশ শতকের প্রথম দিকে স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মির্জা গোলাম পীর এই মসজিদ নির্মাণ করেন। শুরুতে এটি ছিল অপেক্ষাকৃত সাধারণ স্থাপত্যের একটি মসজিদ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব ও পরিচিতি বাড়তে থাকে।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে সমাজসেবী ও ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন। তাঁর উদ্যোগেই মসজিদের দেয়াল, গম্বুজ এবং মিনারে চীনামাটির টুকরো, নীল-সাদা টাইলস এবং অসংখ্য তারকা আকৃতির নকশা সংযোজন করা হয়। এই তারকা নকশার কারণেই মসজিদটি “তারা মসজিদ” নামে পরিচিতি লাভ করে।

স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্য
তারা মসজিদের প্রধান আকর্ষণ এর মোজাইক অলংকরণ। মসজিদের ভেতর ও বাইরে অসংখ্য ছোট-বড় তারকার নকশা সুনিপুণভাবে বসানো হয়েছে। সাদা ও নীল রঙের সমন্বয়ে তৈরি এই নকশা মসজিদটিকে এক অপার্থিব সৌন্দর্য প্রদান করেছে।

মসজিদটিতে রয়েছে পাঁচটি গম্বুজ এবং সামনের অংশে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। দেয়ালে ফুল, লতা এবং জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করা হয়েছে চীনামাটির টুকরো দিয়ে, যা এ অঞ্চলের স্থাপত্যে বিরল। মেহরাব ও মিনারের সূক্ষ্ম কারুকাজ মুসলিম স্থাপত্যের ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব
প্রতিদিন অসংখ্য মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। বিশেষ করে জুমার নামাজ এবং রমজান মাসে মসজিদটি মুসল্লিদের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, এটি স্থানীয় মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও তারা মসজিদ একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। পুরান ঢাকার ইতিহাস ও স্থাপত্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহীরা এখানে এসে মুগ্ধ হন।

ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়াস
তারা মসজিদ বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এর মূল সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা চলছে। নগরায়ণের চাপে পুরনো স্থাপনা যখন হারিয়ে যাচ্ছে, তখন তারা মসজিদ অতীতের গৌরবময় ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে রেখেছে।

ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক
পুরান ঢাকার ব্যস্ত জনজীবনের মাঝেও তারা মসজিদ এক শান্ত, নীরব ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্প ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মসজিদ আমাদের অতীতের গল্প বলে যাচ্ছে এবং আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাচ্ছে।

Share.
Exit mobile version