বাংলার ভোর প্রতিবেদক
দেশজুড়ে ঈদযাত্রা ঘিরে আবারও ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় মার্চ মাসজুড়ে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮৭ জনে। এর মধ্যে ঈদের আগে ও পরের মাত্র ১৫ দিনেই ঝরে গেছে ৩৫৮টি প্রাণ। এমন উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য রোড।

সংগঠনটির মহাসচিব শান্তা ফারজানা জানান, ১৬ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত সময়কালে দেশের বিভিন্ন সড়ক, রেল ও নৌপথে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৫০১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৫৯ জন। তিনি বলেন, “উচ্ছৃঙ্খলতা, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। পরিবহন সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাহনে যাতায়াত করেছেন। বাস না পেয়ে অনেকেই ট্রাক, পিকআপ এমনকি খোলা যানবাহনের ছাদে চড়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

 

সংগঠনটির দাবি, পরিবহন খাতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শতভাগের বেশি ভাড়া দিয়েও অনেক যাত্রী নিরাপদ পরিবহন পাননি।

দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুদের হতাহতের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১ হাজার ৯৩৭ জন নারী ও শিশু আহত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন ২৯৪ জন। এছাড়া ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে আহত হয়েছেন ১ হাজার ১১১ জন এবং নিহত ১৮১ জন। ষাটোর্ধ্বদের মধ্যে আহত ৮১১ এবং নিহত ১১২ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তাহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব নারী ও শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ঈদযাত্রার সময় শুধু দুর্ঘটনাই নয়, সড়কপথে অপরাধও বেড়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে ১২২টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৬ জন। এছাড়া ৩১৬টি শ্লীলতাহানির ঘটনা এবং একটি ধর্ষণের অভিযোগ উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনার অনেকগুলোই ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেননি, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

সড়কের পাশাপাশি নৌ ও রেলপথেও দুর্ঘটনার হার কম নয়। নৌপথে ১০২টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত এবং ১০৩ জন আহত হয়েছেন। রেলপথে ২০টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪ জন এবং আহত হয়েছেন ২১০ জন।

অন্যদিকে আকাশপথে বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে অন্তত ২৫৬ জন যাত্রী ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

এসব দুর্ঘটনায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩২০ কোটিরও বেশি বলে ধারণা করা হয়েছে। এতে শুধু সম্পদের ক্ষতিই নয়, কর্মক্ষম মানুষের প্রাণহানির কারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেভ দ্য রোড-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সড়কে শৃঙ্খলার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন চালক, অতিরিক্ত গতি, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং দুর্নীতি এসব কারণ মিলেই দুর্ঘটনার হার বাড়ছে।

সংগঠনটি আরও দাবি করে, অতীতের মতো বর্তমান সময়েও সংশ্লিষ্ট সেক্টরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে কার্যকর পরিবর্তন আসছে না।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সংগঠনটি ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, প্রতি ৩ কিলোমিটারে পুলিশ বুথ বা ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ। লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ বন্ধ। দুর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ এবং আহতদের ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ। ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠন। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে দুর্নীতি রোধ।

সংগঠনটির মতে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মালিক, শ্রমিক, প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কেবল আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।

Share.
Exit mobile version