বাংলার ভোর প্রতিবেদক
আনন্দময় এক পারিবারিক সফর যে এভাবে বিষাদে রূপ নেবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি মজিদ সরদার কিংবা তার ছেলে জনি। চুয়াডাঙ্গায় শ্বশুরবাড়ি থেকে পারিবারিক অনুষ্ঠান শেষে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু মাঝপথে ঘটে গেল হৃদয় বিদারক ঘটনা। এক মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণহীনতা কেড়ে নিল একই পরিবারের তিনটি প্রাণ।
মজিদ সরদারের একমাত্র ছেলে মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনির চার বছরের মেয়ে শেহেরিশের দাদুর সাথে খেলা করার বয়স ছিলো। সেই খেলার বয়সেই বাবা জনি ও দাদু মজিদ সরদারের মাঝে চিরিদিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকবে অবুঝ, চঞ্চল এই প্রাণ।
সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে যশোর-মাগুরা মহাসড়কের বাঘারপাড়া উপজেলার গাইদঘাট এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন মণিরামপুর বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনি (৪৩), তার বৃদ্ধ বাবা আব্দুল মজিদ সরদার (৭৫) এবং চার বছরের শিশু কন্যা শেহেরিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গায় নানাবাড়ি ও আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন জনি ও তার পরিবার। সারাদিন আনন্দ-উৎসব শেষে নিজেদের প্রাইভেটকারে করে রাতে ফিরছিলেন মণিরামপুরে। জনি নিজেই ছিলেন চালকের আসনে।
পুলিশের ধারণা, দীর্ঘ পথ চলায় হয়তো ক্লান্তি ভর করেছিল তার চোখে। সেই এক চিলতে ঘুমের রেশই কাল হয়ে দাঁড়াল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি রাস্তার পাশের একটি বিশাল বটগাছে সজোরে ধাক্কা খায়।
মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় গাড়িটি। ঘটনাস্থলেই নিথর হয়ে পড়েন জনি ও তার বাবা মজিদ সরদার। হাসপাতালে নেয়ার পথেই চিরদিনের জন্য চোখ বোজে ছোট্ট শিশু শেহেরিশ।
মঙ্গলবার বিকেলে মণিরামপুরের ফাতেহাবাদ গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে বাড়িতে কয়েক ঘণ্টা আগেও উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু কান্নার রোল। পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবর খোঁড়া হচ্ছে, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন তিন প্রজন্মের তিনজন।
গ্রামের প্রবীণ থেকে তরুণ, সবার চোখে জল। স্থানীয় এক বাসিন্দা ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন, “বাবা-ছেলে আর নাতনিকে একসাথে এভাবে কবরে দিতে হবে, তা কোনোদিন ভাবিনি। পুরো গ্রাম আজ স্তব্ধ হয়ে আছে।”
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শুধু তিনজন প্রাণ হারাননি, গুরুতর আহত হয়ে জীবন-মৃত্যুর লড়ছেন পরিবারের আরও তিন সদস্য। জনির মা মনোয়ারা বেগম (৬০), স্ত্রী সাবরিনা জাহান (৩০) এবং ছেলে সামিন আলমাস (১০)। বর্তমানে তারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিজের সন্তান, স্বামী বা বোনের শেষ বিদায়ে শরীক হতে পারেননি তারা। স্বজনদের প্রার্থনা, বাকি তিনজন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত মজিদ সরদার তার পরিবার নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় শ্বশুরবাড়ি একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে যশোরের বাঘারপাড়ার সীমাখালি ও গাইদঘাট এলাকায় পৌঁছালে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারান চালক।
এক পর্যায়ে গাড়িটি সড়কের পাশে থাকা একটি বড় বটগাছে সজোরে ধাক্কা খায়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনার সময় প্রাইভেটকারটি মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনি নিজেই চালাচ্ছিলেন।
বারোবাজার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর কবির জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আসরবাদ জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।
একটি দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণই কেড়ে নেয় না। নিভিয়ে দেয় একটি সাজানো সংসারের প্রদীপও। মণিরামপুরের এই তিন কবরের সারি যেন আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে সড়কের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকা অনিশ্চয়তার কথা।

