হিমেল খান
নতুন ভাবনা, নতুন আঙ্গিক আর সৃজনশীল উপস্থাপনায় বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে প্রস্তুত সাংস্কৃতিক শহর যশোর। একদিকে শোভাযাত্রার ঐতিহ্য রক্ষা, অপরদিকে নতুন বছরকে নাচে-গানে আর শিল্পের মাধ্যমে নতুন বছরকে আহবান। সব মিলিয়ে ব্যস্ত জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
বাংলা বর্ষবরণ শোভাযাত্রার সূতিকাগার চারুপীঠের আয়োজনে যশোরের ঐতিহ্য এখন পাঁচ দশকের কাছাকাছি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের আয়োজনেও থাকছে ভিন্নতা ও নান্দনিকতার ছোঁয়া। শোভাযাত্রাকে আরও বর্ণিল করে তুলতে যুক্ত হচ্ছে নতুন থিম। এবার ১৪৩৪ বঙ্গাব্দের ‘নিত্য নতুনের অমৃত ধারা’ এই প্রতিপাদ্যে সব শিল্পমাধ্যমের সম্মিলনে রঙ ও রসিকতায় মধ্য দিয়ে চারুপীঠের শুরু হবে বর্ষবরণ শোভাযাত্রা।
বাংলা বর্ষবরণের উৎসবের ইতিহাস শত বছরের হলেও যশোরের শোভাযাত্রার সূচনা হয় ১৯৮৫ সালে। সে সময় সৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট বন্ধ হয়ে গেলে ভাস্কর মাহাবুব জামাল শামীম যশোরে ফিরে আসেন। পরে বন্ধু হিরন্ময় চন্দ্র ও নেছারকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন চারুপীঠ। সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু হয় বৈশাখের শোভাযাত্রা। যা সময়ের সাথে হয়ে ওঠে যশোরের অন্যতম সাংস্কৃতিক পরিচয়।
চারুপীঠ যশোরের পরিচালক মাহাবুব জামাল শামীম বলেন, এবার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন থিম নিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে। সব শিল্প একসাথে রঙ ও রসিকতার মাধ্যমে ফুটে উঠবে শোভাযাত্রায়।
চারুপিঠের সাধারণ সম্পাদক কাজী মামুনুর রশীদ বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই চারুপীঠ যশোরের প্রতিবছরের বাংলা বর্ষবরণে নান্দনিক নানা আয়োজন করে আসছে। এবারেও রয়েছে ভিন্নতা।
শুধু চারুপীঠের শোভাযাত্রাই নয়, প্রতিবারের মতো উদীচী যশোরও আয়োজন করছে বর্ষবরণের। তাদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার দুই দিনব্যাপি অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। বৈশাখের প্রথম প্রভাতে পৌর উদ্যানে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে শহরের মানুষ নানান সাজে ভিড় করেন পৌর উদ্যানে। গত ৫ দশক ধরে এটা তাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। সেই আয়োজন করে উদীচী যশোর। এবারও তাদের বর্ণিল প্রস্তুতি রয়েছে।
উদীচীর সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান বিপ্লব বলেন, উদীচীর ৫০ বছর পূর্তিতে এবার বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ দুই দিনব্যাপি আয়োজন করা হচ্ছে।
এদিকে ঢাকাতে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘বৈশাখ শোভাযাত্রা’ করার ঘোষণা দিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চারুপীঠ ও উদীচী শিল্পীগেষ্ঠি। সংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, শোভাযাত্রা বাঙ্গালি ঐতিহ্য, আনন্দ ও সৃজনশীলতার এক চিরস্থায়ী প্রতীক। শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন নিয়ে যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা কাম্য নয়। তাদের মতে, মূল বিষয় নাম নয়, বরং শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য ও সাংস্কৃতিক চরিত্র অটুট রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজ নিজ ভেন্যুতে আয়োজন করবে অনুষ্ঠান। নৃত্য, সংগীত, নাট্যসহ নানা পরিবেশনায় মুখর থাকবে যশোর। শহরের বিভিন্ন সংগঠন ঘুরে দেখা যায়, কেউ মুখোশ তৈরি করছেন, কেউ বাঁশ ও কাগজ দিয়ে বানাচ্ছেন পেঁচা, টিয়া বা ফুলের নকশা। আবার কোথাও বাজছে ‘এসো হে বৈশাখ’ এর সুর। শিল্পিদের রঙ তুলির ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে বৈশাখের প্রস্তুতি।
করোনা মহামারি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে এই আয়োজন। সুরবিতান, উদীচী, পুনশ্চ, সুরধুনী, নৃত্যবিতান, ব্যাঞ্জন, শিল্পাঙ্গন, চাঁদেরহাট, স্পন্দন, সপ্তসুর, ভৈরবসহ যশোরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের চলছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৃত্য, সংগীত, নাট্য, আবৃত্তি ও বাদ্যযন্ত্রের মহড়া। পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমিতেও চলছে প্রস্তুতি।
পুনশ্চ যশোর বরাবরের মতো বর্ষ বিদায় অনুষ্ঠান টাউন হল ময়দানের রওশন আলী মঞ্চে করবে। এবং বর্ষবরণ উপলক্ষে মুসলিম একাডেমী প্রাঙ্গনে সকাল এবং বিকেল দুই বেলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করবে।
অপরদিকে সুরবিতান সংগীত একাডেমি বৈশাখের প্রথম প্রভাতে টাউন হল ময়দানের রওশন আলী মঞ্চে আযোজন করবে তাদের পরিবেশনা। সুরধুনী ও বিবর্তনের যৌথ আয়োজনে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হবে নবকিশলয় স্কুল মাঠে। এছাড়াও কিংশুক সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রেও আয়োজন করছে নিজস্ব প্রাঙ্গনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু জানান, জেলায় ৪০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন এবার বর্ষবরণে অংশ নিচ্ছে। এ কারণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
সাংস্কৃতিক জন হারুন অর রশিদ জানান, বরাবরের মতো এবারও যশোরবাসী মেতে উঠবে বর্ষবরণ উৎসবে এমন প্রত্যাশা সবার।
এদিকে যশোর জেলা প্রশাসক বলছেন, বর্ষবরণের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নতুন বছরকে বরণ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া বরাবরের মতো সকাল সাড়ে আটটায় কালেক্টরেট ভবন চত্বর থেকে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বের হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা।
পুরনো জ্বরা, ক্লান্তি আর ভুলগুলোকে পেছনে ফেলে নতুন দিনের প্রত্যাশায় উচ্ছ্বসিত যশোরবাসী। রঙ, সুর আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে এখন শুধু অপেক্ষা পহেলা বৈশাখের নতুন প্রভাতের।
