ঝিকরগাছা সংবাদদাতা
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গঙ্গানন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ১৮ বিঘা নিজস্ব সম্পত্তির মধ্যে আনুমানিক ১২ বিঘা জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ ঘটনায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি রনী খাতুন।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি বেদখল, নিয়মবহির্ভুত ভাড়া নির্ধারণ, আর্থিক অনিয়ম ও কথিত মালিকানা হস্তান্তর সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হলে উপজেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এর প্রেক্ষিতে ইউএনও প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের নথিপত্রসহ তলব করেন।
জানা যায়, কথিত ২১৪ জন ভাড়াটিয়ার মধ্যে মাত্র একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হন। বুধবার সকালে অনুষ্ঠিত শুনানিতে প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মিঠু, গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, শিক্ষকবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য
আলোচনায় উঠে আসে বিদ্যালয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে ২১৪টি পাকা স্থাপনা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এসব স্থাপনার অধিকাংশই কংক্রিটের গ্রেডবিম ও টেকসই ছাদে নির্মিত। সেখানে গার্মেন্টস, ফার্মেসি, বস্ত্রবিতান, হার্ডওয়্যার, মুদি দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, রড-সিমেন্টসহ নানা ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
একজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে দুই শতাধিক বেঞ্চের সংকটে শিক্ষার্থীরা যেখানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি অনুদানের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে-সেখানে বিদ্যালয়ের নামে শতকোটি টাকার সম্পত্তিতে নিয়মবহির্ভুতভাবে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
‘৩ টাকা থেকে ১৫ টাকা’ তবুও অগ্রহণযোগ্য
প্রধান শিক্ষক শুনানিতে জানান, পূর্বে প্রতি হাত জমির ভাড়া নির্ধারিত ছিল মাত্র ৩ টাকা। বর্তমানে ভাড়াটিয়ারা ১৫ টাকা হারে ভাড়া দিতে রাজি হয়েছেন। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিকে বাজারমূল্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
ইউএনও বলেন, “ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ আছে। কিন্তু আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও নীতিমালার আলোকে তা হতে হবে। অন্যথায় কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবৈধ আর্থিক লেনদেনের দায় প্রতিষ্ঠান বহন করবে না; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই দায় নিতে হবে।”
প্রধান শিক্ষকের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে ঈদুল ফিতর পর্যন্ত সময় মঞ্জুর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভাড়ার অস্বাভাবিক চিত্র
সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বহু বছর আগে নামমাত্র মূল্যে খালি জমি ভাড়া নিয়ে সেখানে পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে এসব দোকান লাখ লাখ টাকায় বিক্রি, হস্তান্তর বা পুনরায় ভাড়া দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ হাত বাই ১০ হাত (মোট ১০০ হাত বা প্রায় ২২৫ বর্গফুট) একটি দোকানের মাসিক ভাড়া দাঁড়াত মাত্র ৩০০-৪০০ টাকা। সে হিসাবে ২১৪টি দোকান থেকে মাসিক ভাড়া আদায় হওয়ার কথা আনুমানিক ৭-৮ হাজার টাকা-যা বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
এছাড়া অনেক ভাড়াটিয়ার মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ভাড়া বকেয়া রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে অনেক ব্যবসায়ী এসব দোকান পরিচালনা করছেন। ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কার্যত অসহায় অবস্থায় রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক কম ভাড়ায় এসব দোকান পরিচালিত হয়ে আসছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শতকোটি টাকার সম্পত্তি এভাবে বেদখল হয়ে থাকলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব?

