ইমরান হোসেন পিংকু
যশোর শহরের ফুটপাত যেন পরিণত হয়েছে চাঁদার রাজত্বে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাজারের বেশি দোকান থেকে প্রায় দুই লাখ টাকার ওপরে চাঁদা তোলা হচ্ছে। যার ভাগ যাচ্ছে রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্তাদের পকেটে। সেই হিসাবে মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকা হারে বছরে প্রায় ৮ কোটি টাকা চাঁদা বাণিজ্য হচ্ছে ফুটপাতে।

দীর্ঘদিন ধরে এই চাঁদাবাজি চলে আসছে। আগে এ চাঁদার অর্থ পেত আওয়ামী লীগের কিছু নেতারা। বর্তমানে বিএনপি, ছাত্রদের তৈরি সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পুলিশের একটি অংশ এই চাঁদার ভাগ গ্রহণকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সড়কভিত্তিক ‘লাইনম্যানদের’ মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয় এবং পরে তা বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও দপ্তরে পৌঁছায়।

এই অবৈধ অর্থের প্রভাবেই ফুটপাত কখনোই পুরোপুরি হকারমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল। ফলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় পথচারীদের চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে, বাড়ছে যানজট এবং জনভোগান্তি। অনেক স্থানে ফুটপাত দখল করে স্থাপনা নির্মাণ বা মালামাল রাখায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

শহরের বিভিন্ন স্থানের ১৫ জন হকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাঁদার টাকা না দিলে দোকান রাখা অসম্ভব। লাইনম্যানরা টাকা তুলে নেয়। তারপর ভাগাভাগি হয়। জেলা ও সদর উপজেলা বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের কিছু নেতা, ছাত্রদের তৈরি সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, পৌরসভা ও পুলিশের কিছু অসৎ সদস্য এই লাইনম্যান নিয়োগ দেন। তবে বেশির ভাগ লাইনম্যান নিজেরাই হকার। তাদের মাধ্যমে টাকা উঠালে ধরা পড়ার ভয় থাকে না। এজন্য হকারদের লাইনম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে চাঁদাবাজ চক্র।

বেশির ভাগ হকারই টাকা দেয়ার কথা স্বীকার করেন না। কারণ এ নিয়ে সংবাদ প্রচার হলে কয়েক দিন চাঁদাবাজদের উৎপাতে দোকান বসানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। চাঁদার টাকা কম দিলে কিংবা কখনো ওপরের আদেশ এলে সারা দিনই প্রশাসন ও হকারদের মধ্যে চলে ইঁদুর বিড়াল খেলা।

যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র দাড়াটানা, চিত্রা মোড়, থানার আশপাশ, মুজিব সড়ক ও প্যারিস রোড এলাকায় বসে প্রায় ৩ শ’ দোকান। এ এলাকায় আছেন চারজন লাইনম্যান। আবার এ ‘লাইনম্যান’ নিজেরাই হকার। তাদের সাথে চাঁদাবাজ চক্রের যোগাযোগ রয়েছে। প্রতিদিন তারা নিজের দোকান ছেড়ে একের পর এক দোকানে যাচ্ছেন আর চাঁদা নিচ্ছেন। বিক্রি কম হওয়ায় দোকানিরা কম টাকা দিলে শাসাতেও ছাড়েন না তারা।

আরএন রোড, মণিহার এলাকার ফুটপাতে আছে ৩শ’ দোকান। খাজুরা বাসস্ট্যান্ডে আছে ১০০ দোকান এবং পালবাড়ি, আরবপুর, ধর্মতলা, বিমান অফিস মোড়ে আছে ৩শ’ দোকান। ব্যবসা হোক আর না হোক, সব মিলিয়ে এখানকার একজন ব্যবসায়ীকে দিনে অন্তত দেড়শ’ থেকে ২০০ টাকা চাঁদা দিতেই হয়। এভাবেই জনগণের হাঁটার জায়গা ভাড়া দিয়ে দেয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি গোষ্ঠী। এসব বিষয়ে কিছু জানে না যশোর পৌরসভা। তারা বিভিন্ন সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। তারপরও দখলমুক্ত হয়না ফুটপাত। উচ্ছেদ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব কিছু আগের মতো হয়ে যায়। প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজিতেই হকারদের কর্তৃত্ব বহাল থাকে বলে মনে করেন অনেকে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সভাপতি অধ্যক্ষ পাভেল চৌধুরী বলেন, ‘ফুটপাত হকারমুক্ত না হওয়ার প্রধান কারণ চাঁদাবাজি। বিভিন্ন গোষ্ঠী এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত এবং তারা বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই চক্রের দাপট বন্ধ করতে পারলে শহরকে হকারমুক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট ও বৈধ জায়গা নির্ধারণ করে দেয়া প্রয়োজন।

যশোর সদর ট্রাফিকের টিআই-১ ইউসুফ আলী চৌধুরী বলেন, আমি নতুন যোগদানের পরপরই দুটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি। ইতিমধ্যে যশোরের পুলিশ সুপারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি এবং কিছু পরিকল্পনাও হাতে নেয়া হয়েছে। শহরের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে হকার উচ্ছেদ করা হবে, অবৈধ ইজিবাইক ও রিকশার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনোভাবেই চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দেয়া হবে না।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু ও সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি। পরে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে সাংগঠনিক মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।’

যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আমরা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কিছু সময় পরই আবার হকাররা বসে পড়ছে, ফলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পৌরসভার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এ ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

Share.
Exit mobile version