বাংলার ভোর প্রতিবেদক
বৈশাখের শুরু থেকে তাপমাত্রা পারদ চড়েছে যশোরাঞ্চলে। তারই মাঠে হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার দুপুরে ওঠে কালবৈশাখি ঝড়। এতে জেলার কেশবপুর, মণিরামপুর, ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলার বহু গ্রামের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুই-আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় চলা এই ঝড়ে আহত হয়েছেন অন্তত আরো ২০ জন।

একই সাথে দুপুরের পর আকস্মিক ঝড় ও বজ্রপাতে বিভিন্ন গ্রাম বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আকাশ কালোমেঘে গুমোট আকার ধারণ করে। কিছু সময়ের মধ্যেই শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড় ও বজ্রপাত। এ সময় মণিরামপুর উপজেলার শাহাপুর গ্রামে বাড়ি থেকে মাঠে যাচ্ছিলেন লুৎফর রহমান সরদার। তখন বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয়রা আরো জানান, ঝড়টি খুব দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বজ্রপাতের শব্দে আশপাশের মানুষ ছুটে এলেও ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর তারা পেয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একইভাবে উপজেলার মশ্বিমনগর ইউনিয়নের পারখাজুরা এলাকায় কালবৈশাখি ঝড় তীব্র আঘাত হানে। বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে এবং অনেকের ঘরের চালের টিন উড়িয়ে নিয়ে যায়। বিভিন্ন গাছ ভেঙে আছড়ে পড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির উপরে। ওই এলাকাসহ ঝাঁপা, হরিহরনগর, রাজগঞ্জ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধে হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, কেশবপুরে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় গাছ ভেঙে বিদ্যুতের খুঁটিরও ওপর পড়েছে। ঝড়ে আহত হয়ে ৯ জন কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে ২ জনকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ঝড়ে প্রায় ১৫০ বিঘা জমির ধান হেলে পড়েছে এবং আম ও কাঁঠালেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

উপজেলার মূলগ্রাম দারুল উলুম আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন জানান, এ ধরনের ঝড় অনেকদিন দেখা যায়নি। আমাদের মাদ্রাসার ছাদের উপর গাছ পড়ে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। একইসঙ্গে এলাকার কৃষকদের ধান, আম ও কাঁঠালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ চলছে। বিভিন্ন স্থানে গাছপালা ভেঙে পড়ায় কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯ জন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তারা শঙ্কামুক্ত।

এদিকে, একই সময় ঝড়ে ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা উপড়ে পড়া, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কৃষি জমিরও আংশিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, ঝড়বৃষ্টিতে জেলা শহরে তেমন ক্ষতি হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় বোরো ধান হেলে পড়েছে; সেগুলোতে তেমন ক্ষতির আশঙ্কা দেখছি না। ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টি ধানের জন্য আশীর্বাদ। তারপরও কোথাও ক্ষয়ক্ষতি হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ জেনারেল ম্যানেজার হাদিউজ্জামান বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে মণিরামপুর ও কেশবপুরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৬টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙ্গে গেছে। অসংখ্য জায়গায় তারের উপর গাছ পড়ে আছে। আমাদের কর্মীরা রাতেও কাজ করছে। তবে সব জায়গায় বিদ্যুৎ লাইন সচল করা সম্ভব হবে না।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের বলেন, বিভিন্ন জায়গায় ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। বজ্রপাতে মণিরামপুরে একজন মারা যাওয়ার খবর আছে। কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; সেটা নিরূপণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

Share.
Exit mobile version