কাজী নূর
বৈশ্বিক অস্থিরতায় তেল সংকটের অজুহাতে বৈশাখি আগুনে যেন পুড়ছে যশোরের সবজি বাজার। সেই সাথে তেঁতে উঠতে শুরু করেছে মুরগি-গরুর মাংসের বাজার। আসন্ন পহেলা বৈশাখে ইলিশের চাহিদাকে সামনে রেখে উত্তপ্ত ছিল মাছের বাজারও। এদিন ইলিশ মাছ বিক্রি হয়েছে মাত্র আড়াই হাজার টাকা কেজি দরে ! আর সয়াবিনের লুকোচুরি ত চলছে সেই ঈদের আগে থেকেই। এমন অবস্থায় নাজেহাল হচ্ছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত।
বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কম তাই বেশি দামে কিনে তেমন দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে ভোক্তাদের অভিমত জ্বালানি তেল নিয়ে যখন অস্থির গোটা দেশ তখন একটি চক্র তা থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টায় রয়েছে। শুক্রবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজি ৫০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়েছে। এদিন মুরগি এবং গরুর বাজার ঘুরে দেখা গেছে সেখানেও চলছে অস্থিরতা।
এদিন সকালে যশোরের বড়বাজার হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড ও রেল স্টেশন বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে মানভেদে কেজি প্রতি কাকরোল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, উচ্ছে ১৪০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, পটল ৯০ থেকে ১০০ টাকা, ঝিঙে ৮০ থেকে ৯০ টাকা, কুশি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শিম ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মেটে আলু ৮০ টাকা, কাঁচা আম ৮০-১০০ টাকা, ধুন্দল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, কচুরলতি ৮০ টাকা, ঢেড়ষ ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ডাটা ৪০ টাকা, পুঁইশাক ৪০ টাকা, সজনে ৪০ টাকা, কাঁচকলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, মানকচু ৫০ টাকা, টমেটো ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বিটরুট ৪০ টাকা, গাজর ৪০ থেকে ৫০ টাকা, পেঁপে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, এঁচোড় ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ো ৪০ টাকা বিক্রি হয়েছে। এছাড়া আকারভেদে লাউ ৫০ থেকে ৭০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা ও সবুজ শাক ২০ টাকা, পালং শাক ৩০ টাকা আঁটি হিসেবে বিক্রি হয়েছে।
জানতে চাইলে সবজি বিক্রেতা রনি রায় বাংলার ভোরকে বলেন, দর নির্ধারিত হয়ে থাকে সরবরাহ কেমন তার উপর। আমরা হাটে, আড়তে মাল পাচ্ছি চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এটি দাম বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ।
আরেক বিক্রেতা আমানুল্লাহ রবি বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা উদ্বেগ গোটা দেশ জুড়ে। মাঠে মাল আছে কিন্তু দাম না পাওয়ার আশংকায় চাষী হাটে বা আড়তে সেটি তুলছেন না। সরবরাহ কম সেই কারণে বেশি দামে আমাদের মাল কিনতে হচ্ছে আবার বিক্রিও তেমন। এটাই বাজারের বাস্তবতা।
এ বিষয়ে পৌর এলাকার চৌরাস্তা বস্তাপট্টির বাসিন্দা অর্ধেন্দু দাস বিজয় বলেন, যে কারণকে দায়ি করে বাজার অস্থিতিশীল করা হচ্ছে আসলে তা ঠুনকো। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন ১০০ টাকা দামের সবজিতে মধ্যস্বত্বভোগীরাই সব নিয়ে যাচ্ছে। খুব বেশি হলে কৃষক হয়ত ৩০ থেকে ৪০ টাকা পায়। এ বিষয়ে প্রশাসন সঠিক নজরদারি করলে আমরা এর সুফল পেতাম।
মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ব্রয়লার জাতের মুরগি ১৭০ থেকে ২১০ টাকা, লেয়ার ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা ও সোনালি ৩৬০ থেকে ৩৭০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। যা এক সপ্তাহ আগেও কেজি প্রতি ১০-২০ টাকা কম দরে বিক্রি হয়েছে।
সাদ্দাম ব্রয়লার হাউজের মালিক সাদ্দাম মোল্লা বলেন, মুরগি পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাচ্ছি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
ঘোপ জেল রোড পিলু খান সড়কের বাসিন্দা গোলাম রসুল প্রশ্ন রেখে বলেন, আমাদের কি করার আছে। ব্যবসায়ীদের কাছে আমরা জিম্মি।
অপরদিকে বড়বাজার কাঠেরপুল এবং রেল স্টেশন বাজারের মধ্যে গরুর মাংসের দামে বেশ তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। রেল স্টেশন বাজারে গরুর মাংস ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। যেখানে কাঠেরপুলে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
কাঠেরপুলে গরুর মাংস বিক্রেতা টিটো শেখ বলেন, আমরা ৮০০ টাকায় মাংস বিক্রি করলেও আমাদের লাভ থাকে না। আমরা ভালো মানের গরু জবাই করি এমন দাবি করে টিটো শেখ আরো বলেন, হাটে গরু নেই। সব খামারি আসন্ন কোরবানিতে বিক্রির জন্য গরু রেখে দিচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন থাকলে শিঘ্রই গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
ওই এলাকার সকল বিক্রেতার বক্তব্যই প্রায় একই রকম। যা শুনে ভোক্তারা বলেন, দেখেন সবাই একসুরে রাঁ বেধেছে। যাতে করে কেউ কিছু বলতে না পারে। আসলে ধান্দা করে মাংসের দাম বাড়ানোর এটা একটা পাঁয়তারা মাত্র। আর এরা এমনই চক্র যে প্রশাসনকেও তারা বোকা বানিয়ে দেয়। আজ না হয় কাল তারা দাম বাড়াবে তারপর প্রশাসন এসে বলবে এই এত না তোমরা কিছুটা কম করো। ব্যাস হয়ে গেল। বাড়তি দাম দিয়ে বোঝ ক্রেতা !
এদিকে, মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে আড়াই থেকে তিন কেজি সাইজের কাতলা মাছ ৩৫০ টাকা, তিন কেজি সাইজের রুই ৫০০ টাকা, কৈ ২০০ টাকা, নাইলোটিকা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, বাটা ১৩০ থেকে ১৮০ টাকা, বেলে ৩২০ থেকে ৭০০ টাকা, পুঁটি ২৫০ টাকা, পাবদা ৩৬০ টাকা, টেংরা ৪০০ টাকা, মায়া ২৪০ টাকা, পাঙাশ ১৪০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া পাঁচশ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১৫০০ টাকা এবং এক কেজি সাইজের ইলিশ ২৫০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
শহরের দড়াটানার বাসিন্দা মিলন হোসেন বলেন, আজ পাবদা ছাড়া সব মাছের দাম বেশি। তাই পাবদা আর পুঁটি নিয়ে ঘরে ফিরছি।
বিক্রেতা জয় বিশ্বাস বলেন, আজ বাজারে মাছের সরবরাহ একটু কম। তাই দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মুদিপণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল ২০৫ থেকে ২০৮ টাকা কেজি, বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৬ টাকা লিটার, সরিষার তেল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি, পাম তেল ১৮৪ টাকা কেজি, আটা ৪০ টাকা, ময়দা ৫৫ টাকা, মসুরি ডাল ৯০ থেকে ১৫০ টাকা, মুগ ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, ছোলার ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, সাদা চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকা, লাল ডিম ৩৬ টাকা ও সাদা ডিম ৩৪ টাকা হালি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া আলু ২০ টাকা, পেঁয়াজ ৩৫ টাকা, রসুন ১০০ টাকা, আদা ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
বড়বাজার কালী বাড়ী এলাকার মুদিপণ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিমু স্টোরের স্বত্ত্বাধিকারী গোপাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, একমাত্র সয়াবিন তেল ছাড়া সবকিছুর দাম স্থিতিশীল রয়েছে। নতুন ডাল উঠছে। শিঘ্রই ডালের দাম কমতে পারে।
চালের বাজার চাল চান্নী ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মিনিকেট চাল মানভেদে কেজি প্রতি ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা, আটাশ ৫৬ থেকে ৬০ টাকা, কাজললতা ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, বাসমতি ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, স্বর্ণা ৫০ টাকা, সুবললতা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ও নাজিরশাইল ৮৫ টাকা বিক্রি হয়েছে।
বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান লোকনাথ ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী অজয় কুমার সাউ বলেন, সামনে নতুন চাল উঠবে। দাম বাড়ার কোন আশংকা নেই।
