বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোরের মণিরামপুরে বরফকল ও ঘের ব্যবসায়ী হিসাবে বেশি পরিচিত রানা প্রতাপ বৈরাগী। স্থানীয় কপালিয়া ও আড়ুয়া বাজারে তার দুটি বরফকল ও মাছের আড়ত রয়েছে। গত সোমবার বিকেলে মুঠোফোনে কপালিয়া বরফকলের অদূরে ঝুম বিউটি পার্লারের সামনের গলিতে ডাকেন তিন দুর্বৃত্ত। একটি মোটরসাইকেলে আগে থেকে আসা তিন দুর্বৃত্তের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে একজন প্রথমে রানার উদ্দেশ্য গুলি করেন। সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশের ক্লিনিকের জানালায় বিদ্ধ হয়। এরপর খুব কাছ থেকে রানার মাথায় তিন রাউন্ড ও বুকে এক রাউন্ড গুলি করা হয়।
মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরেকজন গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে পালিয়ে যান তারা। পূর্ব পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে রানা প্রতাপের পূর্ব পরিচিতরা। মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত স্থান, স্বজন প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

রানা প্রতাপ বৈরাগীর বাড়ি যশোরের কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামে। মণিরামপুর কপালিয়া বাজারে তার একটি বরফ তৈরির কারখানা আছে। কেশবপুরের কাটাখালী বাজারে তাঁর একটি মাছের আড়ত ও বরফকল আছে। এ ছাড়া তিনি নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিডি খবর’ নামের একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কেউ আটক হননি মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত। এর আগে এদিন বিকেলে নিহতের বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী অজ্ঞাত আসামি করে মণিরামপুর থানায় মামলা করেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে এদিন সন্ধ্যায় কেশবপুর স্বরূপপুর শ্মশানে দাহ করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের স্কুল দম্পতি তুষার কান্তি বৈরাগী ও মাধবি লতা বিশ্বাসের ছেলে নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী। এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নিহত রানা বড় সন্তান ছিলেন। ব্যবসায়ীর পাশাপাশি রানা এক সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর তিন উপজেলার সীমান্তে বাড়ি হওয়াতে আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে তার সখ্যতা ছিলো। এক সময়ে জড়িয়ে পড়েন নিষিদ্ধ সংগঠন চরমপন্থী দলে।
এলাকায় একটি বাহিনীও গড়েছিলেন তিনি। পুরনো পত্রপত্রিকায় রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা খবরও প্রকাশিত হয়। যদিও বছর পাঁচেক স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আবারও শুরু করেন ব্যবসা ও সাংবাদিকতা। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডেও জড়িয়ে যান। হঠাৎ এমন নৃশংস হত্যার শিকার হওয়া নিয়েও স্থানীয় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে বাজারের কয়েকজন জানান, ‘রানা আগে (আন্ডার ওয়ার্ল্ডের) নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য ছিলেন। এলাকায় তার একটি বাহিনীও ছিলো। তবে সেটা বছর দশেক আগে। পরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য প্রথমে জড়ান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। এরপর স্থানীয় বাজারে দুটি বরফ কলের মেশিন বসান। একে একে ঘের ও মাছের আড়তের ব্যবসা শুরু করেন। পদ পদবী না থাকলেও তার বাসায় স্থানীয় এমপি, জনপ্রতিনিধিরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ফলে রাজনীতিক পটপরিবর্তনের পর তার বাড়িতে ভাংচুর করেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পরে সম্প্রতি নিজ এলাকায় ফেরেন তিনি। রানার দুই স্ত্রী পৃথক দুটি বাড়িতে বসাবস করেন।
#তিন কারণে হত্যার শিকার রানা!
নৃশংসভাবে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়, পরিবার ও পুলিশ তিনটি কারণ বলছে। প্রথমত, রানা বৈরাগী দুটি বিয়ে করার আগে স্থানীয় কাটাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক ছাত্রী ঝুমুরের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এরপর তারা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। পরে ঝুমুরের অন্যত্র বিয়ে হলে তার স্বামী বিদেশে চলে যান। এর পরেও ঝুমুরের সঙ্গে রানার সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। রানার বরফ কলের এক শ’ মিটার দূরে ঝুমুরের ‘ঝুম বিউটি পার্লার’ করতে সহযোগিতা করেন রানা। নিয়মিত রানা পার্লারে যাওয়া আসা ছিলো। হত্যাকাণ্ড সংগঠিত স্থানও ঝুমুরের বিউটি পার্লালের সামনে। স্থানীয়রা বলছেন, পরকীয়ার জেরে এই হত্যাকাণ্ড জোর দিয়ে বলছেন। দ্বিতীয় কারণ হিসাবে রানা একসময় নিষিদ্ধ চরমপন্থী দলের কর্মী ছিলেন। সে একসময় ভবদহ ও খুলনার ডুমুরিয়া এলাকায় একটি বাহিনীও গড়ে তোলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অপরাধীদের আটকে অভিযান, ক্রস ফায়ার শুরু হলে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ফলে চরমপন্থীদের পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তৃতীয় কারণ হিসাবে বলছেন, জিয়া নামে স্থানীয় ঘের ও বরফকল ব্যবসায়ীর সঙ্গে রানার দীর্ঘদিনের বিরোধ। বছর খানেক আগেও জিয়া রানাকে হত্যার জন্য নানা পরিকল্পনা করেছিলেন। একই সাথে হুমকিও দিয়েছিলেন। সেই বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড আশাঙ্কা করছেন নিহতের পরিবার।
নিহতের প্রথম স্ত্রী সিমা মজুমদার বলেন, ‘আগেও জিয়া রানাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো। কিছুদিন আগেও হুমকি দিয়েছে। ব্যবসা নিয়ে দ্বদ্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে তিনি অভিযোগ করেন। রানার দ্বিতীয় স্ত্রী পিংকি মল্লিক কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমার রানা রাজনীতি করলেও কারোও ক্ষতি করতো না। মানুষের উপকার ও বিভিন্ন ব্যবসা করে তার উন্নতি হওয়াতে এলাকায় কাল হয়ে গেছে। কি এমন অপরাধ করেছে, এমনভাবে তাকে মারতে হলো। আমার সন্তানের কি হবে, আমাদের কি হবে বলে বিলাপ শুরু করেন তিনি।’
নিহত রানার মা স্কুল শিক্ষক মাধবি লতা বিশ্বাসের দাবি, এক সময়ে রাজনীতি করলেও বছর পাঁচ আগে ছেড়েছিলেন রানা। চরমপন্থী হিসাবে বিগত সময়ে পুলিশ তাকে ফাঁসিয়ে ছিলেন। তার অভিযোগ ব্যবসায়ী দ্বন্দ্ব নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে প্রতিপক্ষরা। পৈশাচিক এই হত্যার বিচার চান তিনি।’
পুলিশ বলছে, রানা বৈরাগীর বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি হত্যা, ধর্ষণ ও কেশবপুর থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের তিনটি মামলা রয়েছে। ২০১৪ সালে অভয়নগর থানায় শ্রমিক নেতা ওলিয়ার হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। পরে ২০২০ সালে এই একই থানায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে নিহত রানার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তুষার কান্তি বৈরাগী অজ্ঞাত আসামি করে মণিরামপুর থানায় মামলা করেছেন। নিহত রানার শরীরে বিদ্ধ হওয়া চারটি গুলির উৎস পরীক্ষা চলছে। একই সাথে বিউটি পার্লারের মালিক ঝুমুরের সঙ্গে পরকীয়া, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা চরমপন্থীর পূর্বের কোন বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড সম্পৃক্ততা খুঁজতে তদন্ত শুরু করেছে। আশা করছি, এ হত্যার কারণ দ্রুত সময়ের মধ্যে উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।’

