রুদ্র নীল
জুলাই আগস্টের আন্দোলনে সরকার পতনের পর যশোরের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন চাকলাদার কৌশলে ভারতে চলে যান। ৪ আগস্ট বিকেলে শহরে মিছিল করার পর ওই দিনই সন্ধ্যার পর ভারতের বনগাঁতে নিজের দ্বিতল বিশিষ্ট বাড়িতে গিয়ে ওঠেন শাহিন। এর আগে নিজ পরিবারকে মালয়েশিয়ায় নিজ বাড়িতে নিরাপদে পাঠিয়ে দেন তিনি। সরকার পতনের পর সম্পত্তি রক্ষায় সরকারি আদেশে নিজের স্থাপর অস্থাবর সম্পদ ক্রোক করিয়ে রেখেছেন তিনি। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ সময় তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। এমনকি তিনি কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়ও ছিলেন না। তবে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক স্মরণসভায় তিনি অনলাইনে অংশ নেন। ওই সভায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। প্রায় ৬ ঘন্টা চলা সেই সভায় জেলা উপজেলার প্রায় ২ হাজার নেতাকর্মী ও কট্টর সমর্থকরা অংশগ্রহণ করেন।
সূত্রের দাবি, শাহীন চাকলাদার ভারত ও মালয়েশিয়ায় নিয়মিত যাতায়াত করছেন। ভারতের সীমান্তবর্তী বনগাঁ শহরে তার একটি বাড়ি আছে। যেখানে সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রভাবশালী চাকলাদার গ্রুপের কিছু নেতার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে বলেও সূত্র দাবি করেছে। এছাড়া শাহিন বর্তমানে ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করছেন যার শেষ পাঁচ ডিজিট হচ্ছে ৭৫৭২৭।
তার বিরুদ্ধে অতীতে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও ওঠে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বর্ণ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে আনার হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। আনার হত্যার পর এ বিষয়ে জোর আলোচনা হলেও তা স্তিমিত হয়ে যায় কোন এক অদৃশ্য কারণে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং আইনগতভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
দীর্ঘ ১৮ মাসে যশোর জেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের স্বঘোষিত মাফিয়া শাহিন চাকলাদার সম্পর্কে এতটুকুই জানা গেছে।
এদিকে, ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ড ২০২৪ সালের মে মাসে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ভারতের কলকাতার নিউ টাউনের একটি বিলাসবহুল ভবনে সংঘটিত ওই নির্মম হত্যার ঘটনায় শুরু থেকেই নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। সম্প্রতি এ মামলায় নতুন করে উঠে এসেছে যশোরের সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের নাম। যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এবার দেশের একটি প্রভাবশালী পত্রিকার কলকাতা প্রতিনিধি তার সংবাদে তুলে ধরেছেন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংবাদে বলা হয়েছে, আনার হত্যা মামলার সঙ্গে যুক্ত অভিযুক্ত হিসেবে নাম আসা শাহীন চাকলাদার বর্তমানে ভারতের কলকাতার নিউ টাউন এলাকায় অবস্থান করছেন। সেখানে একটি বহুতল ভবনে তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শাহীন চাকলাদার যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের ৯ জুন আনার হত্যাকাণ্ডে তার নাম অভিযুক্ত হিসেবে প্রকাশ্যে আসে। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি আড়ালে ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি কলকাতায় প্রকাশ্যেই চলাফেরা করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যশোর শহর, সদর উপজেলা ও কেশবপুর এলাকায় সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ নিজ দলের গ্রুপিং ও ভিন্ন দলের মানুষকে হুমকি ও জমি দখলের অভিযোগ আগে থেকেই ছিল শাহীনের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে এক হিন্দু ব্যক্তির জমি দখলের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ওই জমিতে মাদ্রাসা নির্মাণ এবং সেখানে জঙ্গি কার্যকলাপের প্রশিক্ষণের অভিযোগও ওঠে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি বা প্রমাণিত হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
মূলত কেশবপুরে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে শাহিন চাকলাদার শেখ সেলিমের সাবেক দেহরক্ষী ছাত্রনেতা আজিজুর রহমান ওরফে কেএম আজিজের কাছে ভোটে পরাজয় বরণ করে। এই নির্বাচনে পরাজয়ের মূলে শেখ পরিবারের কোন্দল ছিলো বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, কলকাতার নিউ টাউনের একটি ভবনে অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশ থেকে নারীদের নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বতন্ত্র প্রমাণ বা সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
আ.লীগ সরকারের আমলে আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ড দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন সংসদ সদস্যকে বিদেশের মাটিতে হত্যার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এখন প্রশ্ন উঠছে যদি মামলার অভিযুক্তদের কেউ ভারতে অবস্থান করে থাকেন, তবে তিনি কীভাবে আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন?
রাজনৈতিক মহলে দাবি উঠেছে, সংশ্লিষ্ট ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক এবং অভিযোগের সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক।
সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের বহুল আলোচিত আনার হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এসব তথ্য সামনে আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তদন্ত সংস্থার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসায় বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

