কাজী নূর, নলতা থেকে ফিরে
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। বড় বড় কড়াইয়ে চড়ে ১৯০ কেজি ছোলা, বিশাল ডেকে তৈরি হয় ৬০০ কেজি দুধের ফিরনি। লক্ষ্য একটাই প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার রোজাদারের মুখে ইফতার তুলে দেয়া। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশন প্রাঙ্গণে রমযান মাসজুড়ে প্রতি বছরের মতো এবারও বিশাল পরিসরে এই আয়োজন চলছে।
শুক্রবার এই ইফতারে অংশ নিয়ে হলো এক অনন্য অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। হাজারো মানুষের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এ আয়োজন ছিল সত্যিই হৃদয় জুড়ানো।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে ৫০ জন অভিজ্ঞ বাবুর্চির দল শুরু করেন ইফতার বানানো। কেউ ছোলা, কেউ ফিরনি রান্না করছেন, আবার কেউ সিঙ্গাড়া, ডিম সেদ্ধ বা চিড়া ভেজানোর কাজে নিযুক্ত। দুধের সুজি, ছোলা আর সিঙ্গাড়া বানানোর এ কর্মযজ্ঞ চলে দুপুর তিনটা পর্যন্ত।

এ সময়ের মধ্যে বানানো হয় প্রায় পাঁচ মণ আলুর সিঙ্গাড়া, পাঁচ মণ ছোলার ঘুগনি এবং প্রায় পাঁচ মণ দুধের সুজির ফিরনি। তারপর আড়াই থেকে তিনশ স্বেচ্ছাসেবক শুরু করেন রোজাদারদের জন্য ইফতারের প্লেট সাজানোর কাজ। এদের অনেকেরই ২০-২৫ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই সেবায়।

১৯৩৫ সালে সাধক খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ (র.) এই মিশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। শুরুতে স্থানীয়রা বাড়ি থেকে খাবার এনে একসঙ্গে ইফতার করলেও এখন এটি দেশের অন্যতম বড় ইফতার মাহফিলে পরিণত হয়েছে। খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ যতদিন বেঁচে ছিলেন এই ধারা অব্যাহত রাখেন। তার মৃত্যুর পর তৎকালীন খাদেম মৌলভী আনছার উদ্দীন আহমেদ এই আয়োজন আরো বাড়ান। ১৯৫০ সালে এই মাহফিল বড় পরিসরে চালু হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ এক সঙ্গে ইফতার করেন।
স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় নয় সামাজিক সম্প্রীতিরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতি বছর সাতক্ষীরাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে হাজারো মানুষ নলতা শরীফে সমবেত হন। রমযানজুড়ে এ গণ-ইফতার নলতা শরীফকে পরিণত করে এক বৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনস্থলে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে এক সারিতে বসে ইফতার করার দৃশ্যটি এক অভূতপূর্ব আবহ তৈরি করে।

শুক্রবার বাংলার ভোর সাতক্ষীরার কর্মরত সাংবাদিকদের আয়োজনে এ পূণ্যময় মিলনে অংশ নেন বাংলার ভোর সম্পাদক সৈয়দ আবুল কালাম শামছুদ্দীন জ্যোতিসহ পত্রিকায় কর্মরত বিভিন্ন বিভাগের সদস্যরা।
২৫ বছর ধরে প্রধান বাবুর্চির দায়িত্ব পালন করা আমানত আলী জানান, ‘অল্প পারিশ্রমিক পেলেও এই পূণ্যময় কাজে যুক্ত থাকতে পেরে তিনি আত্মতৃপ্তি পান।
নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ ডা. নজরুল ইসলাম জানান, ‘প্রতিদিন ইফতার বাবদ প্রায় ২ লাখ চল্লিশ থেকে ষাট হাজার টাকা ব্যয় হয়। দেশ-বিদেশের ভক্ত ও দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় এই বিশাল অর্থ সংগৃহীত হয়। প্রথম রোজা থেকে শেষ রোজা পর্যন্ত এই আয়োজন চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। ইফতার পূর্ব দোয়াতে দানকারী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পরিচয় ঘোষণা করা হয় এবং তাদের জন্য দোয়া করা হয়।

