বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোরে এলপিজি গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী পাঁচ ডিলারের একটি সিণ্ডিকেট। এলপিজি গ্যাস বিক্রয় ও বিপণন সমিতির কয়েকজন নেতার সহযোগিতায় এই সিণ্ডিকেট জেলার গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন খুচরা ব্যবসায়ী। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

জানা যায়, জেলার কয়েকজন বড় ডিলার ও পরিবেশকের ইশারায় গ্যাসের দাম ওঠানামা করে। কেউ কম দামে গ্যাস বিক্রির চেষ্টা করলে তাকে নানা চাপের মুখে পড়তে হয়। এমনকি নির্দিষ্ট কোম্পানির সিলিণ্ডার সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কম দামে গ্যাস বিক্রি করলে অন্য ডিলাররা ওই ব্যবসায়ীর দোকানে আর গ্যাস সরবরাহ করতে চান না।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও যশোরে সেই দামে গ্যাস মিলছে না। বর্তমানে কোম্পানি ভেদে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার টাকায় গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। অথচ খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা আরও কম দামে গ্যাস বিক্রি করতে সক্ষম।

এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে যশোরে কখনো গ্যাস বিক্রি হয়নি। পরিবেশক ও ডিলাররা সহযোগিতা করলে সাড়ে ১৭শ টাকার মধ্যেই ভোক্তাদের গ্যাস দেয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে ১ হাজার ৭০০ টাকার কাছাকাছি দামে গ্যাস সংগ্রহ করতে পারলেও বাজার পরিস্থিতি ও ডিলারদের চাপের কারণে কম দামে বিক্রি করতে পারেন না। বাসাবাড়িতে পৌঁছে দিতে প্রতি সিলিণ্ডারে অতিরিক্ত ৫০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়।

সূত্র জানায়, যশোরের এলপি গ্যাস বাজারে যমুনা, ক্লিন হিট, বেক্সিমকো, বিএম, ডেল্টা, টোটাল, ওমেরা, ফ্রেশ, সেনা, পেট্রোম্যাক্স, জিগ্যাস ও বেঙ্গলসহ বিভিন্ন কোম্পানির ডিলার হিসেবে কাজ করছেন জেলার প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের অধিকাংশই জেলা এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির পদধারী বা সদস্য।

এদিকে বাজারে নতুন আসা এক পরিবেশক কম দামে গ্যাস বিক্রির চেষ্টা করায় স্থানীয় সিণ্ডিকেটের চাপে তার সাইনবোর্ড পর্যন্ত খুলে ফেলতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে ডিলারদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে গ্যাস বিক্রি করছেন। পরিবেশক ফিরোজ আহমেদ বলেন, সব কোম্পানির গ্যাসের দাম এক নয়। আমরা যেভাবে কিনি সেভাবেই বিক্রি করি। কেউ আমাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় কিনে বেশি দামে বিক্রি করলে সেটি আমাদের দায় নয়।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সম্প্রতি এক নতুন ডিলার ৩৫ কেজির সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের করে পানিমিশ্রিত গ্যাস ছোট সিলিন্ডারে ভরে বাজারজাত করছেন। এ বিষয়ে প্রমাণসহ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আরেক পরিবেশক ও ডিলার মাহবুব আলম লাভলু বলেন, এলপি গ্যাস ব্যবসা মূলত একটি সেবামূলক ব্যবসা। অনেক ক্ষেত্রেই এটি লোকসানের পর্যায়ে চলে যায়। কোম্পানিগুলো নির্ধারিত দামে গ্যাস সরবরাহ করে এবং আমাদের নির্দিষ্ট কমিশন দেয়। একজন ডিলার বা পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা পরিচালনায় ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যাংক সুদ, গুদাম ও অফিস ভাড়া, স্টাফদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়। এছাড়া ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পণ্য বাকিতে বিক্রি করতে হয়, ফলে বড় অঙ্কের অর্থ অনাদায়ী থেকে যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় আমরা অতিরিক্ত মুনাফা করছি-এমন অভিযোগ সঠিক নয়।”

অন্যদিকে ইউনাইটেড আই গ্যাসের পরিবেশক আব্দুল্লাহ ফারুক পানিমিশ্রিত গ্যাস বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না। বরং আমাকে কম দামে গ্যাস বিক্রি না করার জন্য সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল।”

স্থানীয় ভোক্তাদের অভিযোগ, বেশি দাম দিয়েও তারা নিরাপদ গ্যাস পাচ্ছেন না। কোথাও ওজনে কম, কোথাও সিলিণ্ডার ত্রুটি কিংবা পানিমিশ্রণের অভিযোগ রয়েছে। তারা বাজারে সিণ্ডিকেট ভেঙে কার্যকর নজরদারি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

Share.
Exit mobile version