রেহানা ফেরদৌসী
এখন চলছে আরবী রজব মাস। মহান রবের দয়া ও করুণা যে, তিনি মুসলিম উম্মাহকে পবিত্র রজব মাসের শেষ প্রান্তে উপনীত করেছেন। এটি নাম ও অর্থগতভাবেই প্রাচুর্যময় সম্মানিত মাস।
রজব মাসের মর্যাদা
মাসটির পুরো নাম ‘রজবুল মুরাজ্জাব’ বা ‘আর-রজব আল-মুরাজ্জাব’ হলেও এটি রজব মাস নামেই বেশি পরিচিত। মাসটির অর্থগত তাৎপর্য হলো ‘রজব’ শব্দের অর্থ সম্ভ্রান্ত, মহান বা প্রাচুর্যময়। আর ‘মুরাজ্জাব’ অর্থ ‘সম্মানিত’। সুতরাং এর অর্থ দাঁড়ায় ‘প্রাচুর্যময় সম্মানিত মাস’। মর্যাদার এ মাসটিকে মহান আল্লাহ তাআলা যাবতীয় যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। এবং বারো মাসের মধ্যে চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম’ তথা সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকে। সুতরাং তোমরা এই মাসসমূহে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’-সূরা তাওবা : ৩৪
রাসূলাল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, বারো মাসে বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক : যিলকদ, যিলহজ্ব, মহররম আর চতুর্থটি হল রজব, যা জুমাদাল উখরা ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী মাস।’- সহীহ বুখারী ২/৬৭২
রজব মাস হলো রমজানের প্রস্তুতি পর্ব নেয়ার মাস। এ মাস কেবল ইসলামের একটি পবিত্র মাস নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক মাসও। মিরাজের মতো অলৌকিক ঘটনা এবং তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই মাস। এটি আমাদেরকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ প্রদান করে এবং ইসলামের ইতিহাসের স্মরণীয় ঘটনাগুলোকে উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়।
প্রথম হিজরতের প্রস্তুতি
ইসলামের প্রাথমিক যুগে রজব মাসে মুসলমানদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়েছিল। এই মাসে মুসলমানদের একটি অংশ প্রথমবারের মতো হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরত হিসেবে চিহ্নিত।
তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি
রজব মাসে তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। এটি ছিল ইসলামের শেষ যুদ্ধগুলোর একটি, যেখানে মহানবী (সাঃ) নিজে সেনাপতি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। যদিও যুদ্ধটি সরাসরি রজব মাসে সংঘটিত হয়নি, তবে এর প্রস্তুতি এই মাসেই নেওয়া হয়েছিল।
কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণ
ইসলামের ইতিহাসে কাবা ঘর পুনঃনির্মাণের অন্যতম একটি ধাপ রজব মাসে সংঘটিত হয়েছিল। এই পবিত্র ঘর মুসলমানদের কিবলা এবং ইবাদতের অন্যতম প্রধান স্থান।
ঐতিহাসিক চুক্তিসমূহ
রজব মাসে বেশ কিছু ঐতিহাসিক চুক্তি ও সন্ধি সম্পাদিত হয়েছিল, যা ইসলামের সম্প্রসারণ এবং মুসলিম উম্মাহর সংহতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
রজব মাসের ফজিলত
* সম্মানিত মাস : রজব চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম, যা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে।
* আত্মশুদ্ধি ও প্রস্তুতি : এটি রমজানের প্রস্তুতির মাস।
* শবে মেরাজ : এই মাসেই মহানবী (সা.)-এর মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল।
* আল্লাহর সন্তুষ্টি : এই মাসে নফল রোজা রাখলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায় বলে হাদিসে বর্ণিত আছে (যদিও কিছু হাদিস দুর্বল)।
* ক্ষমা প্রার্থনা : রজব মাস উম্মতের ক্ষমা প্রার্থনার মাস হিসেবেও পরিচিত।
করণীয় আমল (ভুল ধারণা পরিহার করে)
* নফল রোজা : সোমবার, বৃহস্পতিবার, এবং মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখসহ অন্যান্য দিনে নফল রোজা রাখা।
* বেশি ইবাদত : কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
* পাপ বর্জন : এই মাসে পাপাচার, মারামারি ও ঝগড়া থেকে দূরে থাকা এবং সংযম পালন করা।
মর্যাদার এ মাসটি মুমিন মুসলমানের ইবাদতের মাস। বরকত লাভের মাস। কেননা রাসুলাল্লাহ (সাঃ)এ মাসের ইবাদত-বন্দেগি করেছেন, রোজা রাখতেন এবং বেশি বরকত অর্জন এর জন্য দোয়া পড়তেন, তার উম্মতকেও দোয়া পড়তে বলতেন। তাহলো ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন; রমজান মাস আমাদের নসিব করুন।’ (বুখারি ও মুসলিম)
বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া- ইস্তেগফার ও রোজা রাখার মতো আমল ইবাদত করে এ মাসে রমজানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার উপযুক্ত সময়। এতে নিজের মন-মানসিকতাকে পরিচ্ছন্ন হবে। রাসূলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘রজব হলো আল্লাহর মাস, শাবান হলো আমার মাস; রমজান হলো আমার উম্মতের মাস।’ (তিরমিজি)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) আরও বলেন, অতি মহান (মর্যাদার) ৪টি রাত হলো-রজব মাসের প্রথম রাত; শাবান মাসের মধ্য দিবসের রাত (শবে বরাত); শাওয়াল মাসের প্রথম রাত (ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদের রাত) জিলহজ মাসের দশম রাত (ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদের রাত)। সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, রজব মাসের মর্যাদা, ফজিলত ও আমলের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা। হাদিসের ওপর যথাযথ আমল করা। রমজানের পরিপূর্ণ ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে রজবের মাসের ফজিলত, মর্যাদা ও আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ করার তাওফিক দান করুন। মাসের শেষে হাদিসে বর্ণিত দোয়াটি বেশি পড়ার কথা স্মরণে রাখুন। রজব মাসের বরকত ও ফযীলত হাসিল করার জন্য অন্যান্য মাসে পালনীয় ফরয ইবাদতগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হবে এবং নফল ইবাদত বেশি বেশি করতে হবে। মুসলমান তথা আমাদের উচিত এই মাসের ফজিলতকে কাজে লাগিয়ে বেশি ইবাদত করা, তওবা করা এবং ইসলামের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা।
লেখক : সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক)

